নিট-ইউজি ২০২৬: প্রশ্নফাঁসের নেপথ্যে ১০০ কোটির ‘পিরামিড’ চক্র, সিবিআই তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

নিট-ইউজি ২০২৬: প্রশ্নফাঁসের নেপথ্যে ১০০ কোটির ‘পিরামিড’ চক্র, সিবিআই তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট-ইউজি ২০২৬)-এর প্রশ্নফাঁস নিয়ে তোলপাড় গোটা দেশ। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) ইতিমধ্যেই পরীক্ষা বাতিল করেছে এবং তদন্তের ভার তুলে দেওয়া হয়েছে সিবিআই-এর হাতে। তবে এই দুর্নীতির শিকড় কতখানি গভীরে, তা নিয়ে উঠে আসছে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এই প্রশ্নফাঁস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ১০০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেনের একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ‘কারবার’।

প্রশ্নফাঁসের ‘পিরামিড’ কাঠামো: কীভাবে কাজ করে এই চক্র?

তদন্তকারী ও বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই চক্রটি একটি পিরামিডের মতো স্তরে স্তরে বিন্যস্ত। এখানে প্রশ্নপত্র সরাসরি পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায় না; বরং তা হাতবদল হয় ‘পাইকারি’ ও ‘খুচরো’ বাজারের মতো নির্দিষ্ট ধাপে।

  • শীর্ষস্তর (মাস্টারমাইন্ড বা সলভার গ্যাং): পিরামিডের মাথায় থাকে মূল হোতারা। এরা সাধারণত ছাপাখানা বা প্রশ্নপত্র পরিবহনের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। এদের মূল লক্ষ্য থাকে কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে প্রশ্নটি ‘পাইকারি’ বাজারে বিক্রি করা।
  • দ্বিতীয় স্তর (অঞ্চলভিত্তিক কিংপিন): মূল হোতার থেকে প্রশ্ন কিনে নেয় কোটা, পটনা বা সিকরের মতো কোচিং হাবগুলোতে সক্রিয় থাকা বড় দালালেরা। তারা একেকজন পরীক্ষার্থীর থেকে ১৫-৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দাবি করে।
  • তৃতীয় স্তর (সলভার ও স্থানীয় সহযোগী): এই স্তরে মেধাবী ছাত্র বা ডাক্তারি পড়ুয়াদের নিয়োগ করা হয় ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সমাধান (Answer Key) তৈরি করার জন্য। এর বিনিময়ে তারা ২-৫ লক্ষ টাকা পায়।
  • চতুর্থ স্তর (ডেলিভারি এজেন্ট): পরীক্ষার ঠিক আগে এরা ‘খুচরো’ বিক্রেতা হিসেবে কাজ করে। সময় যত কমে, প্রশ্নের দামও তত কমে। এমনকি টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে পরীক্ষার আগের রাতে ২৫-৫০ হাজার টাকাতেও প্রশ্ন ও উত্তর বিক্রি হয়।

ভৌগোলিক বিস্তার: নাসিক থেকে সিকর

তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রের জাল দেশের একাধিক রাজ্যে বিস্তৃত। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা মহারাষ্ট্রের নাসিকে একটি বৈঠক করে। সেখান থেকে প্রশ্নপত্রের কপি পাঠানো হয় হরিয়ানায়। সেখানে ৫টি আলাদা সেট তৈরি করে তা পাঠানো হয় রাজস্থানের জয়পুর, জম্বারামগড়সিকরে। এছাড়া অন্ধ্রপ্রদেশ, দিল্লি, বিহার, উত্তরাখণ্ড এবং জম্মু-কাশ্মীরেও এই প্রশ্ন পৌঁছে গিয়েছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

ধরপাকড় ও প্রশাসনিক তৎপরতা

রাজস্থান পুলিশের স্পেশ্যাল অপারেশন গ্রুপ (SOG) ইতিমধ্যেই সিকর থেকে ১৫ জনকে আটক করেছে। জয়পুর থেকে মণীশ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাকে এই চক্রের অন্যতম ‘মূলচক্রী’ বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে লেনদেনের প্রমাণ মুছতে ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের অনুমান।

রাজনৈতিক উত্তাপ ও পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ

পরপর বড় পরীক্ষায় এই ধরণের বিভ্রাটে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী পক্ষ। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী একে ‘যুবসমাজের ভবিষ্যতের প্রতি অপরাধ’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র দাবি করেছেন যে, গত এক দশকে বহুবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে যার খেসারত দিতে হচ্ছে ২০ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থীকে।

বার বার কেন জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় এমন নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, এখন সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সিবিআই তদন্তের মাধ্যমে এই ১০০ কোটি টাকার দুর্নীতির মূল হোতাদের নাগাল পাওয়া যায় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে দেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.