অনুপ্রবেশকারী বিতাড়ন থেকে দ্বিগুণ মহিলা ভাতা, আয়ুষ্মান ভারত! ডবল ইঞ্জিনে এক মাসে গতি কেমন রাজ্যে?

অনুপ্রবেশকারী বিতাড়ন থেকে দ্বিগুণ মহিলা ভাতা, আয়ুষ্মান ভারত! ডবল ইঞ্জিনে এক মাসে গতি কেমন রাজ্যে?

গত ৯ মে, রবীন্দ্রজয়ন্তীর পুণ্যলগ্নে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের ‘শাপথ সমারোহ’ থেকে যাত্রা শুরু করেছিল শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন বিজেপি সরকার। একটি সরকারের মূল্যায়ন করার জন্য এক মাস অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময় হলেও, এই অল্প দিনেই রাজ্য প্রশাসনের নীতি ও কার্যকলাপে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। গত এক মাসে নতুন সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন:

দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তৃণমূল জমানার একাধিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নতুন সরকার। ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা, বালি-পাথর খাদানের কাটমানি থেকে শুরু করে টলিউডের অন্দরের সিন্ডিকেট রাজ— সবক্ষেত্রেই শুরু হয়েছে ধরপাকড়।

  • গ্রেফতার ও সমন: সরকারের প্রথম সপ্তাহে ৭০ জন তৃণমূল নেতা গ্রেফতার হলেও, এক মাসের মাথায় সেই সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। গ্রেফতারের তালিকায় রয়েছেন সুজিত বসু, স্বরূপ বিশ্বাস, দিলীপ মণ্ডল, জাহাঙ্গির খান, অসিত মজুমদার এবং রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নাম। এছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি ও বিধায়কদের সই-কাণ্ডে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে এবং ‘মেসি-কাণ্ডে’ অরূপ বিশ্বাসকে তলব করেছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য তদন্তকারী সংস্থা।
  • নতুন পদক্ষেপ: প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি এবং জিটিএ-তে (GTA) শিক্ষক নিয়োগের তদন্তে সিবিআই-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভুলবশত পুরুষদের অ্যাকাউন্টে যাওয়া ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর টাকা উদ্ধার করতে গঠন করা হয়েছে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)।

মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি: “যেখানেই হাত দিচ্ছি, পচা দুর্গন্ধ। এ বার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে জেল বানাতে হবে।” — মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

পাশাপাশি, দলের ‘তৃণমূলীকরণ’ রুখতে এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বেশ কয়েকজন বিজেপি কর্মীকে নিলম্বিত করা হয়েছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, দুর্নীতিতে যুক্ত থাকলে বিধায়কদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সীমান্ত সুরক্ষা ও অনুপ্রবেশ রোধ

বিগত সরকারের জমিজট সংক্রান্ত আপত্তির কারণে দীর্ঘদিন আটকে থাকা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ গতি পেয়েছে। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই বিএসএফ-কে (BSF) ১৪২.৭৯ একর জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেন মুখ্যমন্ত্রী।

ভোটের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের জেরে গত এক মাসে প্রায় ৫,০০০ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছেন এবং ১,০০০ জন আটক শিবিরে (হোল্ডিং সেন্টার) অপেক্ষমান রয়েছেন।

‘ডবল ইঞ্জিন’ সামাজিক ও স্বাস্থ্য প্রকল্প

কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে মোদী সরকারের একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প রাজ্যে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

  • স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্কিম: সরকারের মাসপূর্তির দিনেই দিল্লিতে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ চালুর উদ্দেশ্যে মউ (MoU) স্বাক্ষর করেছে রাজ্য। এছাড়া ১ জুলাই থেকে ১০০ দিনের কাজের পরিবর্তে নতুন ‘ভিবি-রামজি’ প্রকল্প চালু হচ্ছে। পাশাপাশি ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা’, ‘উজ্জ্বলা যোজনা’ ও ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’-এর মতো প্রকল্পও রূপায়িত হতে চলেছে।
  • ভাতা ও রেশন ব্যবস্থার বদল: পূর্বতন ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’, যেখানে ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ৩,০০০ টাকা করা হয়েছে। বার্ধক্য ভাতা ১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,০০০ টাকা করা হলেও বন্ধ করা হয়েছে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দেওয়া সমস্ত ভাতা (যেমন মোয়াজ্জিম বা পুরোহিত ভাতা)।
  • মা আহার: ‘মা ক্যান্টিন’-এর নতুন নাম হয়েছে ‘মা আহার’। পাঁচ টাকার এই আহারে আমিষ-বিরোধী প্রচার রুখতে সপ্তাহে দু’দিন মেনুতে মাছ-ভাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
  • স্বাস্থ্যক্ষেত্রের উন্নয়ন: স্বাস্থ্যভবন থেকে সরকারি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালু হয়েছে। আমজনতার সুবিধার্থে রাজ্যে ৪০০টিরও বেশি ‘প্রধানমন্ত্রী জনঔষধি কেন্দ্র’ স্থাপন এবং জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধের টিকাকরণ শুরু হয়েছে।

শিল্প ও রেল পরিকাঠামোয় জোয়ার

রাজ্যে বড় শিল্প টানতে আদানি গোষ্ঠীর করণ আদানি এবং ‘লারসেন অ্যান্ড টুব্রো’ (L&T)-র চেয়ারম্যান এস এন সুব্রহ্মণ্যমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠীকে ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দেওয়ার পাশাপাশি তাজপুরের পরিবর্তে দাদনপাত্রবাড়ে সমুদ্রবন্দর গড়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব রাজ্য সফরে এসে রেল পরিকাঠামোয় ১ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা করেছেন। পূর্বতন সরকারের অসহযোগিতার অবসান ঘটিয়ে চিংড়িঘাটায় মেট্রো রেলের বহু প্রতীক্ষিত গার্ডার বসানোর কাজও শুরু হয়েছে।

সরকারি চাকরি ও মহার্ঘভাতা (DA)

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত চালুর ঘোষণা করেছে নতুন সরকার। আবেদনকারীদের সুবিধার্থে সরকারি চাকরিতে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ৫ বছর বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া, পূর্বতন সরকারের সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার নীতি থেকে সরে এসে বকেয়া ডিএ (DA) প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এই সরকার এবং নতুন ‘সপ্তম বেতন কমিশন’ গঠনের ঘোষণাও করা হয়েছে।

উচ্ছেদ বিতর্ক ও বুলডোজার নীতি

অবৈধ নির্মাণ ভাঙতে ‘বুলডোজার’ ব্যবহার এবং হকার উচ্ছেদ নিয়ে রাজ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আদালত স্থগিতাদেশও জারি করেছে। এই বিষয়ে পুরুলিয়ার অধ্যাপক গৌতম মুখোপাধ্যায়ের মতো শিক্ষাবিদরা সরকারকে আরও ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখানোর পরামর্শ দিয়েছেন। হকার ও ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের আর্জিও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

বিরোধী শিবির:

  • মহম্মদ সেলিম (সিপিএম রাজ্য সম্পাদক): “২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর প্রথম এক মাসে যা হয়েছিল, এই সরকারের ক্ষেত্রেও হুবহু তা-ই হচ্ছে।”
  • অধীররঞ্জন চৌধুরী (কংগ্রেস নেতা): “এই সরকার এসেই বাড়ি ভাঙা ও হকার উচ্ছেদের মতো ভাঙচুর শুরু করেছে, শুধু দেখানোর জন্য যে তারা কিছু একটা করছে।”
  • আখরুজ্জামান (বিদ্রোহী তৃণমূলের পরিষদীয় মুখ্য সচেতক): “পুলিশ মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারি ও সন্ত্রাস চালাচ্ছে। এক মাসে হতাশা ছাড়া এই সরকার কিছুই দিতে পারেনি।”

শাসক শিবির:

  • শমীক ভট্টাচার্য (বিজেপি রাজ্য সভাপতি): “দশক পার করে রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা অনুভব করছেন। নির্বাচনী সঙ্কল্পপত্রের সমস্ত প্রতিশ্রুতি আগামী ৫ বছরে সরকার পূরণ করবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.