পূর্বতন তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের শাসনকালে রাজ্যের কোন দফতরে কী কী দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা হয়েছে, তা নিয়ে খুব শীঘ্রই শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে চলেছে রাজ্য সরকার। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বাজেট বিতর্কের জবাবি ভাষণে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা করলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। একই সঙ্গে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি-সহ একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ঘোষণাও করেন তিনি।
প্রতিটি দফতরের কাজের খতিয়ান ও সিএজি রিপোর্ট আসবে জনসমক্ষে
বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার চলাকালীনই বিজেপির তরফে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, ক্ষমতায় এলে পূর্বতন সরকারের আমলের দুর্নীতি নিয়ে কড়া পদক্ষেপ করা হবে। গত মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও বিধানসভায় দুর্নীতি দমনে অনমনীয় মনোভাবের বার্তা দিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত স্পষ্ট জানান, বিগত সরকারের আমলে জমি বণ্টন, জলাভূমি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রকল্প রূপায়ণে যে সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, শ্বেতপত্রে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। সেই সঙ্গে সিএজি (CAG)-র অডিট রিপোর্টও জনসমক্ষে আনা হবে। অর্থমন্ত্রীর কথায়:
‘‘দফতরের পর দফতরের কাজকর্ম নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। অর্থ দফতর ব্যাখ্যা করবে যে, কীভাবে অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারের ঋণের বোঝা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্য দফতরগুলি বোঝাবে, কেন একাধিক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েও শেষ হয়নি। কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো, তা-ও স্পষ্ট করা হবে।’’
উল্লেখ্য, বুধবারই মমতাপন্থী তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছিল যে, কেন্দ্রীয় সরকারের বকেয়া টাকা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অর্থমন্ত্রী পূর্বতন সরকারের দুর্নীতির খতিয়ান সম্বলিত শ্বেতপত্র প্রকাশের পাল্টা চাল দিলেন।
দুর্নীতি দমনে কড়া আইন ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই ঘোষণা করেছেন যে, দুর্নীতি নিয়ে তাঁর সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি নিয়েছে। এই অধিবেশনের শেষ দিনেই দুর্নীতি রোধে একটি অত্যন্ত কড়া আইন আনা হচ্ছে। এই নতুন আইন কার্যকর হলে দোষীদের শুধু জেলেই যেতে হবে না, বরং দুর্নীতিকারীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা নিলাম করা হবে।
মঙ্গলবার বিধানসভায় সুর চড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘হরিশ চ্যাটার্জি, হরিশ মুখার্জি রোড-সহ আমতলার প্রাসাদগুলিতে কলকাতার উড়ালপুলের নীচে থাকা মানুষদের থাকার ব্যবস্থা করব।’’ রাজনৈতিক মহলের মতে, নাম না করে তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পরিবারকেই নিশানা করেছিলেন।
শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি ও অর্থমন্ত্রীর একগুচ্ছ বড় ঘোষণা
এদিনের ভাষণে অর্থমন্ত্রী রাজ্যের শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও সুরক্ষার স্বার্থে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন:
- শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি: রাজ্য সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের শিক্ষকদের বেতন এককালীন ২,০০০ টাকা বৃদ্ধি করার ঘোষণা করা হয়েছে।
- ভবিষ্যৎ বেতন বৃদ্ধির আশ্বাস: চলতি বছরের বাজেটে রাজ্যের কয়েকটি বিভাগের কর্মীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, বর্তমান বাজেটে যাঁদের বেতন বাড়েনি, আগামী বাজেটে তাঁদের বিষয়টি অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
- নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: উত্তরবঙ্গের হেমতাবাদে একটি নতুন কলেজ এবং কালিয়াগঞ্জে শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য একটি কলেজ স্থাপন করা হবে।
- মহিলা সুরক্ষা: নারী সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সন্দেশখালিতে একটি নতুন ‘মহিলা থানা’ গড়ে তোলা হবে।
- অন্নপূর্ণা যোজনা: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী অর্থমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে, প্রকৃত প্রাপক ও যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদেরই ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আওতায় নিখরচায় অন্ন দেওয়া হবে।

