সার্ভিস কোটায় স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি সংক্রান্ত বিতর্ক এবং বহুল চর্চিত ‘থ্রেট কালচার’ কেন্দ্রিক তদন্তে পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য ভবনের দ্বিমুখী অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠল। ছয় মাস আগে যে চিকিৎসক-ছাত্র অভীক দে-কে ‘নির্দোষ’ হিসেবে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল, সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধেই পুনরায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে, উভয় সিদ্ধান্তেই স্বাক্ষর রয়েছে একই পদাধিকারী—রাজ্যের স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা (ডিএমই) ইন্দ্রজিৎ সাহার। স্বাস্থ্য ভবনের এই পদক্ষেপের পর প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন।
মামলার প্রেক্ষাপট ও পূর্ববর্তী অবস্থান আরজি কর কাণ্ডের পর রাজ্য স্বাস্থ্য পরিষেবায় তথাকথিত ‘থ্রেট কালচার’ সঞ্চালনের অভিযোগ ওঠায় এসএসকেএম হাসপাতালের শল্য চিকিৎসা বিভাগের প্রাক্তন পিজিটি চিকিৎসক অভীক দে-কে বিভাগীয় তদন্তের ভিত্তিতে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে, সার্ভিস কোটা ব্যবহার করে তাঁর এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নিয়ে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন চিকিৎসক রৌনক হাজারি। কলকাতা হাইকোর্ট বিষয়টি নিয়ে রিপোর্ট তলব করলে, চলতি বছরের এপ্রিলে স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা ইন্দ্রজিৎ সাহা আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে জানান যে অভীক দে-র সার্ভিস কোটা লাভের ক্ষেত্রে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি।
বর্তমান তদন্ত ও নতুন তথ্য সম্প্রতি স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তার নতুন নির্দেশিকায় অভীক দে-র সার্ভিস কোটায় ভর্তি সংক্রান্ত অনিয়মের তদন্তে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম প্রধানকে এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে। অন্যান্য সদস্যরা হলেন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজের ফরেন্সিক মেডিসিন ও টক্সিকোলজি বিভাগের প্রধান সোমনাথ দাস এবং বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিনের অধ্যাপক কৌশিক মিত্র।
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রানুযায়ী, সার্ভিস কোটায় ভর্তির নিয়ম অনুযায়ী আবেদনকারীকে গ্রামীণ বা দুর্গম এলাকায় চিকিৎসা পরিষেবায় যুক্ত থাকতে হয়। অভীক দে বর্ধমানের অনাময় হাসপাতালে কাজের নথি জমা দিলেও, স্বাস্থ্য ভবনের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে অনাময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান যে উক্ত নামে কোনো চিকিৎসক সেখানে কর্মরত ছিলেন না। ভিজিল্যান্স ব্রাঞ্চের সুপারিশের ভিত্তিতে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
চিকিৎসক সংগঠনগুলির প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনিক অসঙ্গতি স্বাস্থ্য ভবনের এই নতুন নির্দেশের পর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে একাধিক চিকিৎসক সংগঠন। তাঁদের মূল বক্তব্য, শুধু আবেদনকারী নন, যাঁর সুপারিশে ও অনুমোদনক্রমে এই আবেদন মঞ্জুর হয়েছিল, তাঁদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
- নিয়ম সংক্রান্ত অনিয়ম: সার্ভিস কোটায় আবেদন মঞ্জুরের জন্য পঞ্চায়েত এলাকায় অবস্থিত হলেও অনাময় হাসপাতালকে ‘গ্রামীণ’ হিসেবে গণ্য করা এবং কোভিডকালকে ‘দুর্গম পরিস্থিতি’ হিসেবে বিবেচনা করা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা: তৎকালীন সময়ে আবেদনপত্র মঞ্জুর করেছিলেন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ কৌস্তুভ নায়েক (বর্তমানে ইনস্টিটিউট অফ হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ারের ডিরেক্টর)।
- সংগঠনের বক্তব্য: অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের নেতা মানস গুমটা জানান, আদালতে তৎকালীন ক্লিনচিট প্রদানকারী এবং অনুমোদনকারী প্রশাসনিক কর্তাদের বাদ দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়। ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকী ও আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ অনিকেত মাহাতো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশাসনিক সচ্ছলতা ও দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।
তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হলেও, পূর্ববর্তী প্রতিবেদন এবং বর্তমান প্রশাসনিক পদক্ষেপে সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকে এখনও নির্দিষ্ট কিছু জানানো হয়নি।

