ভেনেজুয়েলায় ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্প, নিহত অন্তত ১৬৪, ১০ হাজার মৃত্যুর আশঙ্কা

ভেনেজুয়েলায় ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্প, নিহত অন্তত ১৬৪, ১০ হাজার মৃত্যুর আশঙ্কা

লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় বুধবার সন্ধ্যায় আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, প্রলয়ঙ্করী এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্তত ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৯৭১ জন। বৃহস্পতিবার দেশের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন।

প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ বলেন, “ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও বহু মানুষ আটকে পড়ে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে নিখোঁজদের সন্ধানে বিভিন্ন উদ্ধারকারী দল পৌঁছে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে।” পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন তিনি।

৩৯ সেকেন্ডে তছনছ লাতিন আমেরিকার এই দেশ

স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে পর পর দু’টি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ভেনেজুয়েলা। আমেরিকার ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা (USGS)-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:

  • প্রথম কম্পন: রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭.২। রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার পশ্চিমে, ক্যারিবীয় উপকূলে মোরনের পশ্চিমে এটি আঘাত হানে। এর গভীরতা ছিল ২২ কিলোমিটার।
  • দ্বিতীয় কম্পন: প্রথমটির ঠিক এক মিনিটের মধ্যে মোরনের দক্ষিণ-পশ্চিমে ১৬ কিলোমিটার দূরে আঘাত হানে দ্বিতীয় কম্পনটি। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭.৫ এবং এর গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার।

বিগত এক শতাব্দীর মধ্যে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলির মধ্যে অন্যতম এটি। ইউএসজিএস (USGS) এক ভয়াবহ পূর্বাভাসে জানিয়েছে, এই জোড়া কম্পনের তীব্রতায় দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান ও বিপর্যস্ত জনজীবন

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই জোড়া ভূমিকম্পে দেশের অন্তত ৭৭ লক্ষ নাগরিক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

  • পরিকাঠামো ধ্বংস: ভূমিকম্পের তীব্রতায় রাজধানী কারাকাসের সাইমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের একাধিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে পড়েছে বহু ঘরবাড়ি ও শিল্প পরিকাঠামো।
  • লা গুয়াইরা পুরোপুরি বিধ্বস্ত: দেশের অন্যতম প্রধান বন্দরশহর লা গুয়াইরা এই ভূমিকম্পে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কারাকাস থেকে প্রায় ১,৭০০ কিলোমিটার দূরে ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলেও এই কম্পনের প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতি লক্ষ্য করা গেছে।
  • পরিষেবা বন্ধ: নিরাপত্তার কারণে কারাকাসে মেট্রো পরিষেবা সাময়িকভাবে মুলতুবি রাখা হয়েছে। একই সাথে পাইপলাইনের মাধ্যমে এলপিজি (LPG) সরবরাহও বন্ধ রাখা হয়েছে।

যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ ও আন্তর্জাতিক সাহায্য

ভেনেজুয়েলার সরকারি টেলিভিশনে দেখা গেছে, উদ্ধারকর্মীরা বিদ্যুৎচালিত আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রাণের সন্ধান চালাচ্ছেন। বহু সাধারণ মানুষও নিজেদের নিখোঁজ স্বজনদের উদ্ধারে হাত লাগিয়েছেন। লা গুয়াইরা প্রদেশে ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে ধুলো-কাদায় মাখামাখি অবস্থায় তিন শিশুকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ওখানকার একটি হাসপাতালের বাইরে মেঝেতেই ঠাঁই হয়েছে বহু আহতের।

বিপর্যয়ের এই আবহে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন, যার পরিপ্রক্ষিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় আসতে শুরু করেছে। মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও বৃহস্পতিবার ভোরে এক্স (টুইটার)-এ পোস্ট করে জানান, আমেরিকা তাৎক্ষণিকভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা-সহায়তা এবং মানবিক ত্রাণ ভেনেজুয়েলায় পাঠাচ্ছে। (উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গত জানুয়ারিতে মার্কিন সেনা অপহরণ করার পর থেকে তিনি বর্তমানে আমেরিকার জেলেই বন্দি রয়েছেন)।

আপৎকালীন প্যাকেজ ঘোষণা সরকারের

বিপর্যয় মোকাবিলায় ভেনেজুয়েলা সরকার একগুচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:

  • ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল ও ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণের জন্য ২০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে। অর্থ দফতর ও অর্থমন্ত্রীকে এই কর্মসূচির তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
  • আপৎকালীন পরিস্থিতিতে দেশের নাগরিকদের সুবিধার্থে ইন্টারনেট, ল্যান্ডলাইন টেলিফোন ও টেলিভিশন পরিষেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো দেশবাসীকে আপাতত বহুতল ভবনে না ঢুকে খোলা আকাশের নীচে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ শক্তিশালী ‘আফটার শক’ বা অনুকম্পনের ফলে দুর্বল হয়ে পড়া ভবনগুলি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দেশের এই চরম সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সরকারের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো।

ভেনেজুয়েলায় কেন এই কম্পন বিরল?

ভেনেজুয়েলা মূলত দক্ষিণ আমেরিকান ও ক্যারিবীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে এবং একাধিক ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থিত হলেও, চিলি বা মেক্সিকোর মতো প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী অঞ্চলের তুলনায় এখানে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা বিরল। প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশের ভূকম্পনপ্রবণ টেকটোনিক বলয়, যা ‘রিং অব ফায়ার’ নামে পরিচিত, বিশ্বের ৯০ শতাংশ ভূমিকম্পের জন্য দায়ী। ভেনেজুয়েলা সরাসরি এই বলয়ে না থাকায় এখানে এত তীব্র কম্পন সচরাচর দেখা যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.