ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগাতে ব্যর্থ আদালত ও কাউন্সিলররা, ‘ছেলের বাড়ি ফেরা’র আইনি এক্তিয়ার নেই: হাই কোর্ট

ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগাতে ব্যর্থ আদালত ও কাউন্সিলররা, ‘ছেলের বাড়ি ফেরা’র আইনি এক্তিয়ার নেই: হাই কোর্ট

আইনি লড়াইয়ের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে এক চরম পারিবারিক ট্র্যাজেডির সাক্ষী থাকল কলকাতা হাই কোর্ট। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে যে একমাত্র ছেলে বাবা-মায়ের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করেছেন, তাঁকে কি জোর করে ঘরে ফেরানো যায়? দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনের পর হাই কোর্টের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ— বৃদ্ধ বাবা-মায়ের আসল সমস্যা টাকা নয়, ছেলে। কিন্তু ছেলেকে জোর করে বাড়ি পাঠানো বা কথা বলাতে বাধ্য করার আইনি ক্ষমতা আদালতের নেই। বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের এজলাসে দাঁড়িয়ে বিচারপতি আক্ষেপের সুরে বলেন, “অনেক চেষ্টা করেছি ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর। কিন্তু আমরা ব্যর্থ। কিছুই করার নেই।”

ঘটনার সূত্রপাত ও আইনি জটিলতা

মামলার খতিয়ান অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালে। সোনারপুরের বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আশিসকুমার রায় এবং ইতিহাসের অধ্যাপক গীতা রায় বারুইপুরের মহকুমাশাসক (SDO)-এর কাছে অভিযোগ করেন যে, তাঁদের একমাত্র ছেলে কুশল রায় তাঁদের খোঁজ নেন না। ২০০৭ সালের ‘সিনিয়র সিটিজেন আইন’ মেনে মহকুমাশাসক ছেলেকে বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ বহনের নির্দেশ দেন।

২০২৩ সালে এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন কুশল। উচ্চ আদালত জানায়, মহকুমাশাসক নিজের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে এই নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ বাবা-মা দুজনেই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং আর্থিক ভাবে সম্পূর্ণ সচ্ছল। আদালত পূর্বের নির্দেশ বাতিল করে বাবা-মাকে নতুন করে আবেদনের সুযোগ দেয়।

এরপর বিষয়টি জেলাশাসক (DM) পর্যন্ত গড়ায়। জেলাশাসকও তদন্তে জানতে পারেন, বৃদ্ধ দম্পতির আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁরা অসহায়। তিনি কুশলকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দিলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “আমি ছেলেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বা তাঁদের বাড়িতে গিয়ে থাকতে বাধ্য করতে পারি না। এটা আমার ক্ষমতার মধ্যে পড়ে না।”

“আইআইটি-আইআইএম-এ পড়িয়েছি, আজ ছেলে পর”: আবেগঘন মা

আদালতে কুশলের মা গীতা রায় অশ্রুসজল কণ্ঠে জানান, অত্যন্ত কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেছেন তাঁরা। ছেলে আইআইটি খড়্গপুর এবং আইআইএম আমদাবাদের মতো প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তনী। বর্তমানে তিনি উচ্চপদস্থ এবং প্রতিষ্ঠিত। অথচ গত ১৩ বছর ধরে ছেলে বাড়িতে আসেন না, বাবা-মায়ের ফোন নম্বর ও ইমেল পর্যন্ত ব্লক করে রেখেছেন। গীতা দেবী বলেন, “আমি হৃদরোগে আক্রান্ত, স্টেন্ট বসেছে। স্বামীর ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে। নাতি নীল রায় আমেরিকায় গবেষণা করছে, তার ফোন নম্বর বা ঠিকানাও আমাদের দেওয়া হয় না। ছেলে অন্তত কয়েকদিনের জন্যও বাড়িতে এসে থাকুক।”

পাল্টা সুরক্ষার অভাব ও সম্পত্তির অধিকার ত্যাগের দাবি ছেলের

অন্যদিকে, ছেলে কুশল রায়ের পাল্টা দাবি, তাঁর বাবা-মা অতীতে কলকাতা ও মুম্বইয়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক পুলিশি অভিযোগ করেছেন। যার জেরে তাঁকে হেনস্থার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে বাবা-মায়ের কাছে গেলে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও জানান, আদালতের নির্দেশ মেনে তিনি বাবা-মায়ের স্বাস্থ্যবিমা এবং অন্যান্য আর্থিক দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি বাবা-মায়ের সম্পত্তির সমস্ত উত্তরাধিকারও তিনি স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ডিএম এবং এসডিও-র মাধ্যমে তাঁকে জোর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মধ্যস্থতায় ব্যর্থ চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি

এই মামলাটিকে কেবল আইনি জটিলতা হিসেবে না দেখে একটি মানবিক ও পারিবারিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করে আদালত। বাবা-মা ও ছেলের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান বুঝতে এবং ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগাতে বিচারপতি কৃষ্ণ রাও একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেন। চার সদস্যের এই কমিটিতে ছিলেন:

  • ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট (Clinical Psychologist)
  • সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার (Psychiatric Social Worker)
  • ফ্যামিলি কাউন্সেলর (Family Counselor)

আদালতে পেশ করা রিপোর্টে এই বিশেষজ্ঞ কমিটি অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে জানায়, “আমরা এই সম্পর্ক জোড়া লাগাতে ব্যর্থ। পারিবারিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। কেউ কারও বক্তব্য শুনতে রাজি নয় এবং প্রত্যেকে নিজের অবস্থানে অনড়।” কমিটি আদালতকে আরও জানায়, প্রবীণ দম্পতির সোনারপুরে নিজস্ব দোতলা বাড়ি, গাড়ি, নিয়মিত পেনশন ছাড়াও ১৪৮টি ফিক্সড ডিপোজিট (Fixed Deposit) রয়েছে। ফলে বিষয়টি কোনোভাবেই আর্থিক অভাবের নয়।

আদালতের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

শুনানি শেষে হাই কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষাসংক্রান্ত আইনে স্ত্রী বা সন্তানদের আর্থিক খোরপোশ বা চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া গেলেও, সম্পর্ক ঠিক করার বা সময় দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যায় না।

আদালত কুশল রায়কে তাঁর ‘নৈতিক দায়িত্ব’ (Moral Duty)-র কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলে, সেই মানবিকতাবোধ থেকেই তিনি যেন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা করেন। তবে আদালতের পক্ষে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, আইন মানুষকে দায়িত্বশীল করতে পারে, কিন্তু ঘরের ছেলে করে ঘরে ফিরিয়ে আনতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.