শুভেন্দুর প্রশাসনিক বৈঠকে তৃণমূলের ১ সাংসদ ও ৬ বিধায়ক, কল্যাণের তীব্র কটাক্ষের মুখে ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ বদলের দাবি বিজেপির

শুভেন্দুর প্রশাসনিক বৈঠকে তৃণমূলের ১ সাংসদ ও ৬ বিধায়ক, কল্যাণের তীব্র কটাক্ষের মুখে ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ বদলের দাবি বিজেপির

রাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রীতির এক বড়সড়ো রদবদল লক্ষ্য করা গেল নদীয়ার কল্যাণীতে। মঙ্গলবার কল্যাণীর এপিজে আব্দুল কালাম প্রেক্ষাগৃহে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সভাপতিত্বে উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া এবং হুগলি জেলার এক উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে তিন জেলার বিজেপি সাংসদ ও বিধায়কদের পাশাপাশি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেও। সমস্ত জল্পনা সত্যি করে মুখ্যমন্ত্রীর এই বৈঠকে যোগ দেন তৃণমূলের হেভিওয়েট সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারসহ উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মোট ৬ জন তৃণমূল বিধায়ক। যা নিয়ে বর্তমানে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিরা

মঙ্গলবারের বৈঠকে বারাসতের প্রবীণ তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে নজরকাড়া। এ ছাড়া উত্তর ২৪ পরগনা জেলার যে ৬ জন তৃণমূল বিধায়ক বৈঠকে অংশ নেন, তাঁরা হলেন:

  • আনিসুর রহমান বিদেশ (দেগঙ্গা)
  • বুরহান-উল-মুকদ্দিন লিটন (বাদুড়িয়া)
  • বীণা মণ্ডল (স্বরূপনগর)
  • সুরজিৎ মিত্র বাদল (বসিরহাট দক্ষিণ)
  • উষারানি মণ্ডল (মিনাখাঁ)
  • আব্দুল মতিন (হাড়োয়া)

প্রশাসনিক এই বৈঠকে যোগদান প্রসঙ্গে স্বরূপনগরের তৃণমূল বিধায়ক বীণা মণ্ডল বলেন, “আমি আমার বিধানসভা এলাকার উন্নয়নের স্বার্থেই এই প্রশাসনিক বৈঠকে এসেছি।” একই সুর শোনা গেছে হাড়োয়ার বিধায়ক আব্দুল মতিনের গলাতেও। তিনি জানান, রাজ্য সরকারের আমন্ত্রণেই একজন বিধায়ক হিসেবে তিনি এখানে উপস্থিত হয়েছেন। অন্যদিকে দেগঙ্গার বিধায়ক আনিসুর রহমান বিদেশ জানান, তাঁর এলাকার প্রান্তিক মানুষের সার্বিক উন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকারের সহযোগিতা অত্যন্ত কাম্য।

‘প্রশাসন সবার’: দলীয় পদ হারানোর পরই শুভেন্দুর বৈঠকে কাকলি

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি লোকসভা ভোটের ফলপ্রকাশের পর তৃণমূলের সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতক (Chief Whip) পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় কাকলিকে, যার পরিবর্তে ওই পদে আনা হয় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এই ঘটনার পর দলের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কাকলি লিখেছিলেন, “৭৬ থেকে পরিচয়, ৮৪-তে পথ চলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরস্কৃত হলাম।” ঘটনাক্রমে, গত রবিবারই তিনি বারাসত সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল সভাপতির পদ থেকেও ইস্তফা দেন।

এই আবহে শুভেন্দুর বৈঠকে তাঁর যোগদান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কাকলি ঘোষ দস্তিদার অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও রাজনৈতিকভাবে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দিয়ে বলেন,

“প্রশাসন সবার।”

“ফ্যাসিবাদী সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক সাজে না”: কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

তৃণমূলের একাংশ বৈঠকে যোগ দিলেও এই আমন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট জানান যে, হুগলি জেলার কোনো তৃণমূল সাংসদই এই বৈঠকের আমন্ত্রণ পাননি।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বলেন, “হুগলির সাংসদদের কি ডাকা হয়েছিল? আমি জানি না। আর ডাকলেও যাওয়ার প্রশ্ন ছিল না। ফ্যাসিবাদী সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমার বৈঠক করা সাজে না। যখন আমার দলের কর্মীরা আক্রান্ত, তাঁদের জীবিকা আক্রান্ত, তখন গিয়ে আমি বৈঠক করব? বিজেপির সঙ্গে যাঁদের প্রেম আছে তাঁরা করুন।”

অনুরূপ সুর শোনা গেছে হুগলির আরামবাগের তৃণমূল সাংসদ মিতালী বাগের গলাতেও। তিনি জানান, কোনো আমন্ত্রণ না পাওয়ায় তাঁর যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

গরহাজির বিধায়কদের বিবিধ কারণ

বর্তমানে এই তিন জেলা মিলিয়ে তৃণমূলের মোট ৭ জন লোকসভা সাংসদ (বসিরহাট আসনটি হাজি নুরুল ইসলামের প্রয়াণে শূন্য) এবং ১৫ জন বিধায়ক রয়েছেন। আমন্ত্রণ পেলেও অনেকে নিজস্ব ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক কারণে বৈঠকে উপস্থিত হতে পারেননি।

নদীয়ার কালীগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক আলিফা আহমেদ এবং পলাশিপাড়ার রুকবানুর রহমান জানান, পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি ও কোরবানি সংক্রান্ত স্থানীয় সমস্যার কারণে তাঁরা আসতে পারেননি। অন্যদিকে মধ্যমগ্রামের বিধায়ক রথীন ঘোষ এবং চণ্ডীতলার স্বাতী খন্দকার দুজনেই পায়ে চোট পাওয়ার কারণে জেলা প্রশাসনকে নিজেদের অনুপস্থিতির কথা আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। তবে আমডাঙার তৃণমূল বিধায়ক কাশেম সিদ্দিকি সরাসরি জানান, “আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি দলনেত্রীকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি আমাকে যেতে নিষেধ করেছেন, তাই যাইনি।” কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র বা কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রদের (যিনি বর্তমানে দিল্লিতে রয়েছেন) মতো অনেকেই ফোন না ধরায় তাঁদের আমন্ত্রণের বিষয়টি স্পষ্ট জানা যায়নি।

‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ বদলের দাবি মুখ্যমন্ত্রীর

বিরোধী দলের সবাইকে আমন্ত্রণ না জানানো প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “আমরা ঠিক করেছিলাম কিছু বিশেষ বিশেষ সাংসদকে আমন্ত্রণ জানাব। বিধায়কদেরও ডাকা হয়েছিল। ওঁরা এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বলার সুযোগও পেয়েছেন।”

বিজেপির দাবি, পূর্বতন সরকারের আমলে প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী দল তথা বিজেপির বিধায়ক-সাংসদদের ডাকাই হতো না। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে, এখন থেকে প্রশাসনিক বৈঠকে দলমত নির্বিশেষে বিরোধীদেরও ডাকা হবে। কল্যাণীর এই ঘটনাকে সেই দীর্ঘদিনের ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছে শাসকদল বিজেপি। ফ্র্যাঞ্চাইজি বা সরকারি স্তরে এখানে কোনো রাজনীতি নেই বলেই দাবি তাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.