ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে কেরিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার অনন্য নজির গড়তে চলেছেন লিওনেল মেসি। তবে বিগত পাঁচটি বিশ্বকাপের তুলনায় এবারের বিশ্বমঞ্চ আর্জেন্টিনার অধিনায়কের কাছে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, কেরিয়ারে এই প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেতাব রক্ষার এক কঠিন ও নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নামছেন তিনি। সম্ভবত এটিই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ, আর তাই দলকে পুনরায় বিশ্বসেরা করতে মাঠ ও মাঠের বাইরে বাড়তি দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন ‘এলএম টেন’।
স্কালোনির অধীনে মেসির পরিসংখ্যান ও মাঠে তাঁর প্রভাব
লিওনেল স্কালোনি আর্জেন্টিনার কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে লিওনেল মেসিকে মোট ৭০টি ম্যাচে দলে পেয়েছেন। এর মধ্যে আলবিসেলেস্তেরা জয় পেয়েছে ৫৩টি ম্যাচে, ড্র করেছে ১১টিতে এবং পরাজিত হয়েছে মাত্র ৬টি ম্যাচে। অর্থাৎ, মেসিকে নিয়ে স্কালোনির সাফল্যের হার ৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে, মেসিকে ছাড়া খেলা ২৪টি ম্যাচের মধ্যে আর্জেন্টিনা জিতেছে ১৮টিতে, ড্র ৩টি এবং হার ৩টি; যেখানে সাফল্যের হার ৭৫ শতাংশ।
পরিসংখ্যানের দিক থেকে এই পার্থক্য সামান্য মনে হলেও, ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠের ভেতর মেসির উপস্থিতি দলের মানসিক শক্তি ও রণকৌশলে এক বিশাল ইতিবাচক পার্থক্য তৈরি করে দেয়। এর প্রমাণ মিলেছে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বেও। ১৮টি ম্যাচের মধ্যে ৬টিতে মেসি না খেললেও, ৫ ম্যাচ বাকি থাকতেই বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। শুধু তাই নয়, ৮টি গোল করে যোগ্যতা অর্জন পর্বে সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন মেসি নিজেই। বিশ্বকাপ ছাড়াও স্কালোনির অধীনে দেশকে দুটি কোপা আমেরিকা এবং একটি ফাইনালিসিমা ট্রফি জিতিয়েছেন তিনি।
রণকৌশলে বদল: রক্ষণেও মেসির অবদান
ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭৮ এবং ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনা দল আগ্রাসী ফুটবল খেলে বিশ্বজয় করেছিল। তবে বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনি দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলার ধরনে পরিবর্তন এনে রক্ষণভাগকে শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন, যা ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও দেখা গিয়েছিল। কোচের এই নতুন দর্শনে মেসির পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।
বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কড়া ট্যাকল এবং কড়া নজরদারি থেকে মেসিকে মুক্ত রাখতে স্কালোনি তাঁকে একটু নীচ থেকে খেলানোর কৌশল নিয়েছেন। নিজের অর্ধের মাঝামাঝি জায়গা থেকে প্রতিপক্ষের বক্স পর্যন্ত দলের আক্রমণভাগকে নেতৃত্ব দেন মেসি, আবার দলের প্রয়োজনে নিচে নেমে রক্ষণভাগকেও সাহায্য করেন।
‘মেসি আমাদের নেতা, আমরা তাঁর সৈনিক’: আলভারেজ
মাঠের বাইরেও দলের সতীর্থদের জন্য মেসির ভূমিকা এক অভিভাবকের মতো। জাতীয় দলের সতীর্থদের উৎসাহিত করতে তাঁর ফোন সবসময় খোলা থাকে। এমনকি চোট বা অন্য কারণে যে ম্যাচগুলিতে তিনি খেলতে পারেন না, তার আগেও দলীয় সতীর্থদের পরামর্শ দেন।
দলের তরুণ স্ট্রাইকার ইউলিয়ান আলভারেজ় মেসির এই ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন:
“যোগ্যতা অর্জন পর্বে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে অ্যাওয়ে ম্যাচে যখন আমরা ১-০ গোলে জিতেছিলাম, সেই ম্যাচের আগে মেসি আমাদের ভিডিও কল করেছিলেন। তিনি আমাদের উৎসাহিত করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। তিনিই আমাদের আসল নেতা, আর আমরা তাঁর সৈনিক। মেসির জন্য আমরা মাঠে সবকিছু করতে পারি। দলে মেসি না থাকলে আমাদের ভালো লাগে না, মনে হয় কিছু একটার অভাব রয়েছে। মাঠে ও ড্রেসিংরুমে তাঁর উপস্থিতিই আমাদের জন্য অনেক বড় বিষয়।”
বিশ্বকাপে মেসির অবিশ্বাস্য রেকর্ড
বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসি এ পর্যন্ত ২৬টি ম্যাচ খেলে ১৩টি গোল করেছেন। বিশ্বমঞ্চে রেকর্ড ১০ বার তিনি ‘ম্যাচের সেরা’ (ম্যান অফ দ্য ম্যাচ) নির্বাচিত হয়েছেন এবং একমাত্র ফুটবলার হিসেবে দুবার বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ জয় করেছেন।
আলভারেজ়সহ গোটা আর্জেন্টিনা শিবিরের বিশ্বাস, এবারের বিশ্বকাপেও মেসি বিশ্ববাসীকে বেশ কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেবেন। মাঠের বাইরে দলকে চাঙ্গা রাখা এবং মাঠের ভেতরে যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সতীর্থদের পাশে থেকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার যে বাড়তি দায়িত্ব মেসি নিজের ওপর নিয়েছেন, তা আর্জেন্টিনাকে আবারও সাফল্যের শিখরে নিয়ে যাবে।

