হরমুজ প্রণালীতে তীব্র সংঘাত: ইরানের ‘গ্রেটার তুনব’ দ্বীপে আমেরিকার বিমান হামলা, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি

হরমুজ প্রণালীতে তীব্র সংঘাত: ইরানের ‘গ্রেটার তুনব’ দ্বীপে আমেরিকার বিমান হামলা, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের চতুর্থ দিনে নাটকীয় মোড় নিল পরিস্থিতি। পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে মোতায়েন ইরানি সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ‘গ্রেটার তুনব’ দ্বীপে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বিমানবাহিনী।

পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনার সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টিকম) বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রায় ৯০ মিনিট ধরে চালানো এই বিমান হামলার মূল নিশানা ছিল দ্বীপে অবস্থিত ইরানের অত্যাধুনিক রেডার ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো। ১৯৭১ সাল থেকে এই দ্বীপটি ইরানের দখলে রয়েছে। সেন্টিকমের দাবি, এই অভিযানের ফলে ওই অঞ্চলে ইরানি ফৌজের সামরিক সক্ষমতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

“সব সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেব”: ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

গ্রেটার তুনব দ্বীপে হামলার পরপরই ইরানের প্রতি চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ফক্স নিউজ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, ইরান যদি অবিলম্বে শান্তিপ্রক্রিয়ায় ফিরে না আসে, তবে আগামী সপ্তাহে তাদের আরও বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। ট্রাম্প বলেন:

“আগামী সপ্তাহে তাদের (ইরান) জন্য পরিস্থিতি সত্যিই খারাপ হয়ে যাবে। তারা যদি আলোচনার টেবিলে এসে সমঝোতা না করে, তবে আমরা তাদের দেশের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতু ধ্বংস করে দেব।”

মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, এই বিমান হামলার ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজগুলোর ওপর ইরানের হামলা চালানোর ক্ষমতা এখন তলানিতে ঠেকেছে। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ার পর শুরু হওয়া এই সংঘাতের আবহে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধ অব্যাহত থাকবে।

হামলায় হতাহত বহু সাধারণ মানুষ, দাবি ইরানের

আমেরিকার এই আগ্রাসী সামরিক অভিযানের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের সরকারি সূত্রের খবর অনুযায়ী, শুধু গ্রেটার তুনব দ্বীপই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের ইরানশাহর শহরের কাছে একটি সেনাশিবিরেও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। ওই হামলায় ইরানের অন্তত ৭ জন সেনা নিহত হয়েছেন।

ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমে মোহাজেরান সমাজমাধ্যমে এক বিবৃতিতে মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা করে লিখেছেন:

“দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলায় ৩৫ জনেরও বেশি নিরীহ অসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।”

পাশাপাশি, ইরানের স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, মার্কিন হামলায় আহতের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে।

ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণার মুখে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের তৎপরতা

নতুন করে এই যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসকে ইতিমধ্যেই একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে দেশের ভেতরেই এই যুদ্ধ নিয়ে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হচ্ছে ট্রাম্পকে।

প্রেসিডেন্ট যাতে একক সিদ্ধান্তে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে গত মাসেই মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষ— হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সিনেটে ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ (যুদ্ধ ক্ষমতা আইন) সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস করা হয়েছিল। এবার নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ট্রাম্পের হাত বাঁধতে মার্কিন কংগ্রেসে নতুন করে ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’ বা যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যাডাম শিফ।

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইরানের এই প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত বিশ্ব রাজনীতি তথা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড়সড় উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.