পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার দফতর বণ্টন সম্পন্ন হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরই রাজ্যের শিল্প, শিক্ষা ও অর্থ দফতরের নতুন মন্ত্রীরা নিজেদের অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের পর প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনার চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেছেন তাঁরা।
নতুন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নকে নতুন গতি দেওয়া এবং দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করাই তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, নতুন সরকারের অধীনে পশ্চিমবঙ্গকে একটি শিল্পবান্ধব রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর মতে, গত ১৫ বছরে শিল্প ও কৃষি— উভয় ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
তাপস রায়ের দাবি, শিল্পোন্নয়নের স্বার্থে রাজ্যে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও উন্নত করতে হবে। তিনি জানান, আসন্ন বাজেটে শিল্পক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে নতুন কিছু ঘোষণা করা হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, “শিল্পে হারানো গরিমা ফিরিয়ে আনতে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
টাটা গোষ্ঠীকে পশ্চিমবঙ্গে ফেরানোর প্রসঙ্গেও আশাবাদী শিল্পমন্ত্রী। তাঁর মতে, টাটা ফিরে এলে অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও রাজ্যে শিল্প স্থাপনের আগ্রহ বাড়বে। তিনি দাবি করেন, টাটার প্রস্থানের পর গত ১৫ বছরে বহু বিনিয়োগকারী পশ্চিমবঙ্গ ছেড়েছেন এবং সেই পরিস্থিতি বদলানোই এখন সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
বুধবার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন মন্ত্রী নিজ নিজ দফতরে গিয়ে আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্কুলশিক্ষা মন্ত্রী দীপক বর্মণ বলেন, একজন শিক্ষক, বিধায়ক এবং বর্তমানে মন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রথমে দফতরের বর্তমান পরিস্থিতি ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নিতে চান। বিষয়গুলি গভীরভাবে পর্যালোচনা করার পরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, বিকাশ ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও মানোন্নয়নের উপর জোর দেন। তাঁর দাবি, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা সমস্যা ও অনিয়ম তৈরি হয়েছিল, যা দূর করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
জগন্নাথ বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে মেধার বিকাশ এবং গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হবে। পাশাপাশি এসএসসি, পিএসসি, সিএসসি, পুলিশ, পুরসভা এবং পঞ্চায়েত-সহ বিভিন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তাঁর কথায়, “দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং ঘুষমুক্ত চাকরির ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা— সর্বত্র নিয়োগ হবে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে।”
রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানিয়েছেন নতুন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গের অর্থব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে নতুন পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতির প্রয়োজন রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির পুনর্গঠনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, রাজ্যের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিশেষ ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার তিনি শিলিগুড়ি সফরে যাবেন এবং চা-বাগান এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে স্থানীয় সমস্যাগুলি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তাঁর মতে, রাজ্যের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি জরুরি হলেও করের বোঝা বাড়ানো সমাধান নয়।
স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার বিভিন্ন ত্রুটি ও ফাঁকফোকর চিহ্নিত করে রাজস্ব আদায়ের দক্ষতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, করের হার বৃদ্ধি করলেই যে রাজস্ব বাড়বে, এমন নয়; অনেক ক্ষেত্রে কর কাঠামোকে আরও কার্যকর করে রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
নতুন সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যে স্পষ্ট, শিল্পায়ন, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং রাজস্ব বৃদ্ধি— এই চারটি ক্ষেত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আগামী দিনে প্রশাসনিক সংস্কারের পথে এগোতে চায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

