বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর দক্ষিণ ২৪ পরগনার এককালীন তৃণমূল গড় হিসেবে পরিচিত ফলতায় রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ উল্টে গেল। গত লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই বিপুল লিড পেয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এবারের বিধানসভা ভোটের বিশেষ পুনর্নির্বাচনের পর সেখানে কার্যত ‘ফাঁকা মাঠ’ পাচ্ছে বিজেপি। রবিবার ফলঘোষণার আগে ফলতা কেন্দ্র নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী পদ্মশিবির। গেরুয়া নেতৃত্বের একাংশের দাবি, ফলতা-সহ রাজ্যের ২০৮টি আসনে জয় এখন সময়ের অপেক্ষা, এখন শুধু দেখার জয়ের ব্যবধান কত হয়।
অন্য দিকে, পুনর্নির্বাচনের প্রচার থেকে শুরু করে ফলপ্রকাশের আগের দিন অর্থাৎ শনিবার পর্যন্ত ফলতার মাটিতে কার্যত অস্তিত্বহীন রইল তৃণমূল কংগ্রেস।
ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ ও কমিশনের নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত
গত ২৯ এপ্রিল রাজ্যে শেষ দফার বিধানসভা নির্বাচন চলাকালীন ফলতা কেন্দ্রের একাধিক বুথের ইভিএম (EVM)-এ আতর, কালি ও টেপ লাগানোর মতো গুরুতর কারচুপির অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে স্বয়ং বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী ফলতায় নতুন করে ভোট করানোর জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে জোরালো দাবি জানান। অভিযোগ খতিয়ে দেখে কমিশন নজিরবিহীনভাবে ফলতার গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটই বাতিল করে এবং সম্পূর্ণ কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়।
কমিশনের এই সিদ্ধান্তের পর গত ২ মে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে তিনি লিখেছিলেন:
“দশ জন্মেও আমার ডায়মন্ড হারবার মডেলকে দমাতে পারবে না বাংলাবিরোধী গুজরাতি গ্যাং। দিল্লি থেকে যত শক্তিশালী, যাকে খুশি আনুন, ক্ষমতা থাকলে ফলতায় লড়ে দেখান।”
৪ মে-র পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
গত ৪ মে রাজ্যের বাকি ২৯৩টি আসনের ফলপ্রকাশের পর ফলতার রাজনৈতিক দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। যে এলাকায় অতীতে বিরোধীরা প্রচারই করতে পারত না বলে অভিযোগ ছিল, সেখানে পুনর্নির্বাচনের আবহে উল্টে তৃণমূলই উধাও হয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, বিজেপিকে নিজে থেকে তৃণমূলকে প্রচারে নামার জন্য আহ্বান জানাতে দেখা যায়।
সবচেয়ে বড় চমক আসে ভোটের মাত্র দু’দিন আগে, যখন ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান হঠাৎ ঘোষণা করেন যে তিনি আর এই নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকছেন না। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত ফলতার উন্নয়ন ‘প্যাকেজ’-কে স্বাগত জানিয়ে ময়দান ছাড়েন তিনি।
বন্ধ দলীয় কার্যালয়, ভোটের দিনও দেখা মেলেনি প্রার্থীর
গত ২১ মে (বৃহস্পতিবার) ফলতার ২৮৫টি বুথে পুনর্নির্বাচন সম্পন্ন হয়। ভোটের দিন জাহাঙ্গির খানের বাড়ির দরজায় তালা ঝুলতে দেখা যায়। যে দলীয় কার্যালয়ে তিনি দিনের অধিকাংশ সময় কাটাতেন, সেটিও ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ।
বেলসিংহ-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৯০ নম্বর বুথের ভোটার জাহাঙ্গির খান ও তাঁর স্ত্রী রেজিনা বিবি। বাড়ির ঠিক সামনে শ্রীরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে বৃহস্পতিবার তাঁর স্ত্রী রেজিনা বিবিকে মুখে মাস্ক পরে ভোট দিতে দেখা গেলেও, তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গিরকে কেউ ভোটকেন্দ্রে আসতে দেখেননি।
নির্ভার বিজেপি, নজর কেবল জয়ের ব্যবধানে
তৃণমূলের এই নিষ্ক্রিয়তার মাঝেই বৃহস্পতিবার ফলতায় নজিরবিহীনভাবে ৮৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট হওয়ায় রবিবার গণনা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব।
এক স্থানীয় বিজেপি নেতার কথায়, “এই ফলতা থেকেই তো গত লোকসভা ভোটে ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ভোটের লিড পেয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার মানুষ নিজের ভোট নিজে ঢেলে দিতে পেরেছেন। তাই সেবারের লোকসভা ভোটের ফলাফলের পেছনে আসল রহস্য কী ছিল, তা রবিবারের ফলই পরিষ্কার করে দেবে।”

