বৃহস্পতিবার কিশোর ভারতী স্টেডিয়ামে সমর্থকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের কারণে ট্রফি নিয়ে যে উৎসব অপূর্ণ থেকে গিয়েছিল, শুক্রবার লাল-হলুদ তাঁবুতে তা পূর্ণতা পেল। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের (AIFF) পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারদের হাতে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (ISL)-এর ট্রফি ও পদক তুলে দেওয়া হলো। আর ট্রফি হাতে পেতেই মাঠের মধ্যে নেচে-গেয়ে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখলেন ফুটবলাররা, যা ময়দানে এক নজিরবিহীন দৃশ্যের জন্ম দিল।
সমর্থকদের ঢল ময়দানে, উল্লাসে শামিল ফুটবলাররা
বৃহস্পতিবার রাতেই আইএসএল ট্রফি চলে এসেছিল ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে। শুক্রবার দুপুরের মূল অনুষ্ঠানের বহু আগে থেকেই তাঁবু চত্বরে ভিড় জমাতে শুরু করেন হাজার হাজার লাল-হলুদ সমর্থক। উন্মাদনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ফুটবলারদের বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ক্লাব প্রাঙ্গণে ঢুকতে বেশ বেগ পেতে হয়। তবে সমর্থকদের এই অতি-উৎসাহে দলের কেউই বিন্দুমাত্র বিরক্ত হননি। উল্টে প্রভসুখন গিল এবং এডমুন্ড লালরিনডিকার মতো ফুটবলারদের গাড়ি থেকে নেমেই সমর্থকদের সাথে উল্লাসে মেতে উঠতে দেখা যায়।
পোডিয়ামে পদক প্রদান ও মাঠের বুকে বিজয় নৃত্য
অনুষ্ঠানের শুরুতে ক্লাবের পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের প্রধান কোচ, ক্লাবের সভাপতি, শীর্ষ কর্তা দেবব্রত সরকারসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা। মূল অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয় মাঠের মাঝখানে তৈরি একটি পোডিয়ামে, আর গ্যালারি জুড়ে ছিলেন সমর্থকেরা।
একে একে সমস্ত ফুটবলার এবং কোচিং স্টাফদের গলায় পদক পরিয়ে দেওয়ার পর যখন ট্রফিটি দলের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন মাঠ ও গ্যালারির আবেগ একাকার হয়ে যায়। লাল-হলুদ জার্সি গায়ে মাঠের মধ্যেই ট্রফি নিয়ে নাচতে শুরু করেন আনোয়ার আলি, মহম্মদ রশিদ ও কেভিন সিবিলেরা। চোটের কারণে ক্রাচ বগলে নিয়েই সেই নাচে যোগ দেন স্প্যানিশ তারকা সাউল ক্রেসপো। ইউসেফ এজেজারি এবং অ্যান্টন সোজবার্গের মতো বিদেশি রিক্রুটদেরও সতীর্থদের সাথে তাল মেলাতে দেখা যায়। তবে সবথেকে বেশি আনন্দ করতে দেখা গিয়েছে এডমুন্ড এবং আনোয়ারকে। গ্যালারিতে তখন ক্লাবের থিম সং-এর তালে নাচছিলেন সমর্থকেরা।
“এই দলে কেউ পিছনে ছুরি মারে না”: শৌভিক চক্রবর্তী
ট্রফি উৎসবের পর এক সাংবাদিক বৈঠকে দলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও একতার কথা তুলে ধরেন সিনিয়র মিডফিল্ডার শৌভিক চক্রবর্তী।
দলের মানসিকতা নিয়ে শৌভিক বলেন:
“আমি অনেক দলেই খেলেছি, যেখানে দেখেছি সতীর্থ ফুটবলাররাই পেছনে ছুরি মারে। সুযোগ না পেলে দলের মধ্যে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করে। কিন্তু বর্তমান ইস্টবেঙ্গল দলে তেমন মানসিকতার একজনও নেই। আমি সবসময় চেয়েছি এই ইতিবাচক পরিবেশটা পুরো দলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে ১০ জন নিয়ে লড়ে যে ৩-৩ ড্র আমরা করেছিলাম, সেটাই আমাদের ট্রফি জয়ের পথে সবথেকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল।”
“ট্রফি বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না”: প্রভসুখন গিল
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে প্রভসুখন গিলের সেই অবিশ্বাস্য ‘সেভ’ ফুটবলপ্রেমীদের মতে ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়ন করেছে। তবে ব্যক্তিগত কৃতিত্বের চেয়ে দলের দীর্ঘ লড়াইকে এগিয়ে রাখছেন এই পঞ্জাবি গোলকিপার।
গিল তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান:
“আইএসএলের শেষ ১৩টি ম্যাচের কথা বাদ দিন, আমরা বিগত ১১-১২ মাস ধরে ধারাবাহিক পরিশ্রম করে গিয়েছি। ডার্বি ম্যাচে আমার কাছে নিজের দায়িত্ব পালন করার একটা সুযোগ এসেছিল এবং আমি সেটাই করেছি। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা সুপার কাপও জিতেছি, কিন্তু এই ট্রফিটি ঘরের মাঠে এসেছে। এই ট্রফি কঠোর পরিশ্রম করে অর্জন করতে হয়, বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না।”
সুপার কাপের পর ঘরের মাঠে আইএসএল ট্রফি জয়— এই দ্বিমুখী সাফল্যে লাল-হলুদ শিবিরে এখন শুধুই উৎসবের আবহ।

