রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলে আর্থিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগে রাজ্য জুড়ে শুরু হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের গণ-গ্রেফতারি। গত সাত দিনে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তৃণমূলের ৭০ জনেরও বেশি নেতা, কাউন্সিলর ও পঞ্চায়েত প্রতিনিধিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (ইডি)।
তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, ধৃতদের বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতি, অবৈধ সম্পত্তি অর্জন, সাধারণ মানুষকে হুমকি-মারধর এবং সরকারি জমি জবরদখল ও জালিয়াতির মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা এই মেগা অভিযানে প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুর ইডির হাতে গ্রেফতারির পর এবার জেলা ও ব্লকের ‘দাপুটে’ নেতাদের জালে তুলতে তৎপরতা বাড়িয়েছে পুলিশ। শুধুমাত্র শনিবারই রাজ্য জুড়ে অন্তত ১৭ জন তৃণমূল নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
কলকাতা ও বিধাননগরে হেভিওয়েট গ্রেফতারি
শনিবার কলকাতা এবং বিধাননগর এলাকা থেকে মোট আট জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম কলকাতা পুরসভার ১২৩ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর সুদীপ পোল্লে। অন্যদিকে, বিধাননগরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর সম্রাট বড়ুয়াকে তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করেছে বাগুইআটি থানার পুলিশ। সম্রাট বড়ুয়া তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা দেবরাজ চক্রবর্তীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
হুগলিতে জমি দখল ও সিন্ডিকেট রাজ: বিধায়কের হুঁশিয়ারি
হুগলির কোন্নগর পুরসভার ২০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর বাবলু পাল ওরফে খোকনকে গ্রেফতার করেছে উত্তরপাড়া থানার পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি জমি জাল দলিল করে বিক্রি করা, বেআইনি ব্যবসা এবং সরকারি জমিতে দলীয় কার্যালয় বানানোর মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। উত্তরপাড়ার বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তীর উপস্থিতিতে এই গ্রেফতারি সম্পন্ন হয়। বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তী বলেন:
“বিগত ২০ বছর ধরে উনি সরকারি জমি দখল করে রেখেছিলেন। এবার এই বেআইনি নির্মাণে বুলডোজার চালানো হবে এবং তার সমস্ত খরচ এই তৃণমূল কাউন্সিলরের থেকেই উসুল করা হবে।”
এছাড়াও, ২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগে হুগলির দাদপুর থানার পুলিশ হারিট গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল সদস্য আলতাব হোসেন মল্লিককে গ্রেফতার করেছে।
হাওড়া ও নদীয়ায় ‘শাহজাহান মডেলের’ অবসান
হাওড়ার জগৎবল্লভপুরে ২০২১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী হিংসা, বিজেপি কর্মীদের মারধর ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগে গোবিন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান গুরুপদ মাঝি ও তাঁর ভাই রাজু মাঝিকে গ্রেফতার করেছে জগৎবল্লভপুর থানার পুলিশ।
অন্যদিকে, নদীয়ার আড়ংঘাটায় গ্রেফতার করা হয়েছে তৃণমূল নেতা রমজান আলি মণ্ডল এবং তাঁর প্রধান সহযোগী প্রদীপ সাঁতরাকে। বিরোধীরা রমজানকে এলাকার ‘শাহজাহান শেখ’ বলে কটাক্ষ করত। স্থানীয়দের অভিযোগ, রমজানের অনুমতি ছাড়া এলাকায় কোনো বাড়ি বা দোকান তৈরি করা যেত না এবং তাঁর সিন্ডিকেট থেকেই চড়া দামে বালি-সিমেন্ট কিনতে হতো। ধানতলা থানার পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করে রানাঘাট আদালতে পেশ করেছে।
মুর্শিদাবাদ ও পশ্চিম বর্ধমানে ধরপাকড়
মুর্শিদাবাদের বড়ঞা থানার পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে কুলি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানের স্বামী তথা দাপুটে তৃণমূল নেতা আবু বক্করকে গ্রেফতার করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে সেলিম বারি নামে এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুনের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে।
পশ্চিম বর্ধমানের পাণ্ডবেশ্বরে নির্বাচনী সন্ত্রাস ও তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য তথা শ্রমিক সংগঠনের সম্পাদক শেখ কামরুদ্দিন। যদিও কামরুদ্দিনের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই বিজেপি পুলিশকে দিয়ে তাঁকে ফাঁসিয়েছে।
দিনহাটায় প্রাক্তন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ উপপ্রধান জেল হেফাজতে
কোচবিহারের দিনহাটায় ভোট-পরবর্তী হিংসায় এক বিজেপি কর্মীকে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগে প্রাক্তন মন্ত্রী উদয়ন গুহের ঘনিষ্ঠ তথা বড় শাকদল গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ভবরঞ্জন বর্মণকে গ্রেফতার করেছে সাহেবগঞ্জ থানার পুলিশ।
আদালতের সরকারি আইনজীবী নিহাররঞ্জন গুপ্ত জানান, ২০২৪ সালের নির্বাচনী ফলপ্রকাশের পর অজয় অধিকারী নামে এক বিজেপি কর্মীকে তৃণমূল কার্যালয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর এবং ৫০ হাজার টাকা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ভবরঞ্জনের বিরুদ্ধে। শনিবার দিনহাটা আদালত ধৃত উপপ্রধানের ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে।
| জেলা | ধৃত তৃণমূল নেতার নাম ও পদমর্যাদা | প্রধান অভিযোগ |
| কলকাতা | সুদীপ পোল্লে (কাউন্সিলর, ১২৩ নং ওয়ার্ড) | আর্থিক দুর্নীতি ও জালিয়াতি |
| বিধাননগর | সম্রাট বড়ুয়া (কাউন্সিলর, ৬ নং ওয়ার্ড) | তোলাবাজি |
| হুগলি | বাবলু পাল ওরফে খোকন (কাউন্সিলর, ২০ নং ওয়ার্ড) | সরকারি জমি দখল ও জাল দলিল তৈরি |
| নদীয়া | রমজান আলি মণ্ডল (অঞ্চল নেতা) | সমান্তরাল প্রশাসন ও সিন্ডিকেট রাজ |
| কোচবিহার | ভবরঞ্জন বর্মণ (উপপ্রধান, বড় শাকদল) | অপহরণ, মারধর ও অর্থ দাবি |
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ করা হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলিতেও দুর্নীতি ও হিংসার বিরুদ্ধে এই কঠোর অভিযান জারি থাকবে।

