ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর শীর্ষস্তরের চার দিনব্যাপী মহাপরিচালক (DG) পর্যায়ের বৈঠক বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। তবে দীর্ঘ ঐতিহ্যের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে, ৫৭তম এই সীমান্ত শীর্ষবৈঠক শেষে দুই দেশের বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনও যৌথ সাংবাদিক বৈঠক (Joint Press Conference) করা হয়নি। প্রথা ভেঙে যৌথ আলোচনার নথিতে স্বাক্ষরের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি না হওয়ার এই ঘটনাকে নজিরবিহীন ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল। সংবাদ সংস্থা পিটিআই (PTI) জানিয়েছে, বৈঠকের নির্যাস নিয়ে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকের পরিবর্তে কেবল একটি প্রেস বিবৃতি প্রকাশ করা হবে।
সীমান্তে হামলা ও অনুপ্রবেশ নিয়ে সরব বিএসএফ
দিল্লির লোদী রোডে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (BSF)-এর সদর দফতরে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফ-এর ডিজি প্রবীণ কুমার। বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত সুরক্ষার ক্ষেত্রে একাধিক উদ্বেগজনক বিষয় উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলি হলো:
- বিএসএফ জওয়ান এবং ভারতীয় নাগরিকদের ওপর বাংলাদেশি নাগরিকদের উপর্যুপরি হামলার ঘটনা।
- বাংলাদেশি দুষ্কৃতী ও অনুপ্রবেশকারীদের দ্বারা সীমান্ত বেড়া ভাঙার প্রচেষ্টা।
- আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে কড়াকড়ি।
বিজিবি-র আপত্তি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
গত সোমবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB)-র প্রধান মেজর জেনারেল মহম্মদ আশরাফুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল দিল্লিতে পৌঁছায়। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত রবিবার ঢাকায় জানিয়েছিলেন যে, বিএসএফ-এর কথিত ‘পুশ ব্যাক’ এবং সীমান্তে গুলি চালানোর ঘটনাগুলি বাংলাদেশ এই বৈঠকে জোরালোভাবে উত্থাপন করবে।
রাজনৈতিক দিক থেকে এই বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে নতুন বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর এটিই ছিল দুই দেশের প্রথম সীমান্ত বৈঠক। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায় যখন সর্বশেষ ডিজি-স্তরের বৈঠক হয়েছিল, তখন বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় ছিল।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এবং পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মোট ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে, যার অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ২,২১৬ কিলোমিটার অংশ পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি নিম্নরূপ:
- মোট সীমান্ত দৈর্ঘ্য: ৪,০৯৬ কিমি
- পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন সীমান্ত: ২,২১৬ কিমি
- বেড়াবিহীন সীমান্ত: প্রায় ৮৬০ কিমি
- দুর্গম/নদীমাতৃক অঞ্চল (যেখানে বেড়া দেওয়া অসম্ভব): ১৭৪.৫১ কিমি
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বিতাড়িত করতে পর্যায়ক্রমিক ‘থ্রিডি অ্যাকশন’ (ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট বা শনাক্তকরণ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং বহিষ্কার) কার্যকর করা হবে।
বৈঠকের ইতিহাস
উল্লেখ্য, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ডিজি-স্তরের এই সীমান্ত বৈঠক ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বছরে একবার অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৯৩ সাল থেকে এটি বছরে দুইবার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার একটি নয়াদিল্লিতে এবং অন্যটি ঢাকায় পর্যায়ক্রমে আয়োজিত হয়ে আসছে। তবে এবারের বৈঠকের পর যৌথ সাংবাদিক বৈঠক না হওয়া দুই দেশের বর্তমান সীমান্ত সম্পর্কের টানাপোড়েনকেই স্পষ্ট করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

