তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে পড়ার ঘটনায় কলকাতা পুরসভার এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব তথা কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের তৎকালীন ওএসডি (অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি) কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটক করল পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এদিন সকালেই বিধানসভায় নাম না করে তাঁকে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
মুখ্যমন্ত্রীর নিশানা ও রাতের পদক্ষেপ
বৃহস্পতিবার সকালে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তারাতলাকাণ্ড নিয়ে সরব হয়ে মন্তব্য করেন,
‘‘কলকাতা পুরসভায় কালী না-বললে কোনও প্ল্যান (পাশ) হয় না।’’
মুখ্যমন্ত্রী পুরো নাম উচ্চারণ না করলেও, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে বিষয়টি বুঝতে অসুবিধা হয়নি। এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাতে পুলিশ কালীচরণকে আটক করে।
কলকাতা পুরসভায় কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রভাবশালী নাম। একসময় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে কর্মরত কালীচরণ পরবর্তীকালে আমলা হিসেবে প্রশাসনে যোগ দেন। ২০১৮ সালের শেষ দিকে শোভন চট্টোপাধ্যায় পদত্যাগ করার পর ফিরহাদ হাকিম কলকাতার মেয়র হন। সেই সময়ই পুরসভায় প্রবেশ ঘটে কালীচরণের। তিনি ফিরহাদ হাকিমের ‘ডান হাত’ এবং অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ফিরহাদের ওএসডি পদের পাশাপাশি সাংসদ তহবিল এবং বিধায়ক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের কন্ট্রোলিং অফিসারও ছিলেন তিনি। অভিযোগ, পুরসভায় তাঁর এতটাই প্রভাব ছিল যে, তাঁর অনুমোদন ছাড়া শহরের কোনও নির্মাণকাজ এগোতে পারত না।
তদন্তের কেন্দ্রে পুরসভার ভূমিকা ও ত্রুটিপূর্ণ নকশা
বুধবার তারাতলার যে নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদটি ভেঙে পড়ে, সেটির কলকাতা পুরসভার অনুমোদন ছিল। খোদ মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় জানিয়েছেন যে, ওই গুদামের অনুমোদনপত্রে তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের স্বাক্ষর ছিল।
পুলিশ সূত্রের খবর, এই ঘটনার পেছনে পুরসভার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, সংশ্লিষ্ট নির্মাণটির নকশা অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং নির্মাণের আগে কোনো মাটি পরীক্ষাও (Soil Testing) করা হয়নি। এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ নকশায় কীভাবে এবং কার নির্দেশে ছাড়পত্র দেওয়া হলো, তা জানতেই মূলত কালীচরণকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তারাতলা বিপর্যয়ের বর্তমান পরিস্থিতি
তারাতলার এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান ও তদন্তের অগ্রগতি নিচে দেওয়া হলো:
- মৃত ও আহত: এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যাঁরা বর্তমানে এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
- গ্রেফতার: পুলিশ এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে, যার মধ্যে ৪ জনের নাম এফআইআর-এ নথিভুক্ত ছিল।
- জমির মালিকানা: তদন্তে জানা গেছে, গুদামটির জমি কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৩০ বছরের জন্য লিজে নিয়েছিল ‘বেহরা ব্রাদার্স’ নামের একটি সংস্থা। সংস্থার মালিক শম্ভুনাথ বেহরাকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, লিজ নেওয়া জমিতে যেকোনো নির্মাণের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয়। সূত্রের খবর, এই নির্মাণের ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো আপত্তি জানায়নি। উল্লেখ্য, এই কলকাতা বন্দর এলাকাটি ফিরহাদ হাকিমের বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। এই ঘটনায় স্থানীয় স্তরে ‘সিন্ডিকেটরাজ’-এর অভিযোগও তুলছেন বিরোধীদের একাংশ। লালবাজার পুলিশ পুরো ঘটনার তদন্ত জারি রেখেছে।

