ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কেন্দ্রীয় ক্রীড়ানীতি মেনে চলতে বাধ্য নয়—এই অবস্থান স্পষ্ট করে ওড়িশা হাই কোর্টে হলফনামা দাখিল করেছে বোর্ড। ওড়িশা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (ওসিএ) আসন্ন নির্বাচন ২০২৫ সালের জাতীয় ক্রীড়ানীতি মেনে পরিচালনা করার পরামর্শ দিয়েছিল ওড়িশা হাই কোর্ট। তার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়ে বোর্ডের আইনজীবীরা আদালতকে জানিয়েছেন, বিসিসিআইয়ের নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজস্ব সংবিধান অনুযায়ীই পরিচালিত হবে এবং ২০১৯ সালের লোধা কমিশনের সুপারিশ মেনেই এই সংবিধান সংশোধিত হয়েছে।
পেশায় আইনজীবী ও বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকীয়া নিজে এই মামলার তদারকি করছেন এবং বোর্ডের পক্ষ থেকে হাই কোর্টে হলফনামা জমা দিয়েছেন। আদালতের কাছে বোর্ডের যুক্তি, ক্রিকেট যেহেতু ‘নির্ধারিত খেলা’র আওতাভুক্ত নয়, তাই ন্যাশনাল স্পোর্টস বোর্ডের (এনএসবি) নীতি মানতে বিসিসিআই বাধ্য নয় এবং তারা তা করতে ইচ্ছুকও নয়। বোর্ডের দাবি, লোধা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ইতিমধ্যেই পদাধিকারীদের কার্যকালের মেয়াদ নিয়ন্ত্রণ এবং ‘কুলিং অফ’ বা বিরতি পর্বের নিয়ম সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এই মামলার জট তৈরি হয়েছে ওড়িশা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব অবস্থানকে কেন্দ্র করে। ওড়িশার ক্রিকেট কর্তারা আদালতে সাফ জানিয়েছেন যে, তাঁরা সরকারি নির্দেশ মেনে চলতে প্রস্তুত এবং কোনো পদাধিকারীকে দু’দফার বেশি দায়িত্বে রাখা হবে না। নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন করানোর ব্যাপারেও তারা বদ্ধপরিকর। তবে ওড়িশার এই পদক্ষেপ বিসিসিআইয়ের নীতির সরাসরি পরিপন্থী। জাতীয় ক্রীড়ানীতি মেনে নির্বাচন হলে বোর্ড সেই নির্বাচনকে স্বীকৃতি না-ও দিতে পারে, যার ফলে ওসিএ-এর সদস্যপদ হারানোর মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। উল্লেখ্য, গত বছর অগস্টে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে জাতীয় ক্রীড়া বিল নিয়ে আলোচনার সময় অন্ধ্রপ্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তথা বিজয়ওয়াড়ার সাংসদ কেসিনেনি শিবনাথ বিলটিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
বিসিসিআই যেহেতু সরকারের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য নেয় না, তাই তারা কেন্দ্রীয় ক্রীড়া আইন মানতে বাধ্য নয়—কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনের এমন একটি আরটিআই-এর জবাবকে বরাবরই আইনি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন বোর্ড কর্তারা। কিন্তু একাধিক রাজ্য ক্রিকেট সংস্থাও জাতীয় ক্রীড়ানীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বোর্ডের অন্দরেই মতবিরোধ ও সংঘাতের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে বোর্ডের এক কর্তা একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, সরকার নিজেই নতুন নীতি মেনে নির্বাচন পরিচালনার জন্য ক্রীড়া সংস্থাগুলিকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা দিয়েছে। অনেক রাজ্য সংস্থাও সেই সময় পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক। বোর্ডের নীতিগত অবস্থান প্রশাসনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পক্ষে, কিন্তু সরকারি নীতি বাধ্যতামূলক হলে তা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। কেন্দ্র ও বোর্ডের সাংবিধানিক দ্বন্দ্বের জেরে রাজ্য সংস্থাগুলির মধ্যেও যথেষ্ট সংশয় তৈরি হয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিসিসিআইয়ের শেষ নির্বাচনের সময় জাতীয় ক্রীড়ানীতি কার্যকর না থাকায় কোনো সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে আগামী বছর বোর্ডের সহ-সভাপতি রাজীব শুক্লর মেয়াদ শেষ হতে চলেছে এবং তিনি সহ-সভাপতি হিসেবে টানা ছ’বছর পূর্ণ করবেন। অন্যদিকে, ২০২৮ সালে সচিব দেবজিৎ শইকীয়ারও ছ’বছরের কার্যকাল শেষ হবে। লোধা কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের দুজনেই ‘কুলিং অফ’ বা বাধ্যতামূলক বিরতিতে যেতে বাধ্য। কিন্তু কেন্দ্রীয় ক্রীড়া নীতি অনুসরণ করলে এই কুলিং অফের নিয়ম বাধ্যতামূলক নয়। এই পরিস্থিতিতে বোর্ডের শীর্ষকর্তাদের মধ্যেও একরকম দোটানা তৈরি হয়েছে।

