মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বড়সড় কূটনৈতিক পটপরিবর্তন। ইরানের ওপর দীর্ঘদিন ধরে জারি থাকা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করার ঘোষণা করল আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। সোমবার মার্কিন অর্থ দফতরের পক্ষ থেকে ইরানের তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে একটি ৬০ দিনের বিশেষ লাইসেন্স জারি করা হয়েছে।
কী এই নতুন ছাড়পত্র?
মার্কিন অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ইরানের জন্য একটি ‘সাধারণ লাইসেন্স’ (General License) ইস্যু করা হয়েছে।
- সময়সীমা: এই লাইসেন্সটি আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
- সুবিধা: এই ৬০ দিন ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ এবং বিক্রি করতে পারবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, সুইৎজ্যারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে চলমান ফলপ্রসূ আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্ত।
কেন এই সিদ্ধান্ত? আমেরিকার প্রাপ্তি
অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, সুইৎজ্যারল্যান্ডের প্রথম দফার আলোচনায় ইরানের কাছ থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পেরেছে আমেরিকা: ১. হরমুজ প্রণালী: বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালীতে সমস্ত জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দিয়েছে তেহরান। ২. পরমাণু কর্মসূচি পরিদর্শন: আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের ইরানে গিয়ে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ও কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরান সরকার।
মার্কিন অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সের নেতৃত্বে আমরা বিশ্বকে আরও নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ করে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।”
বারগেনস্টক বৈঠক: নাটকীয়তা ও কাতার-পাকিস্তানের মধ্যস্থতা
চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির রূপরেখা তৈরির উদ্দেশ্যে সুইৎজ্যারল্যান্ডের বারগেনস্টকে (Bürgenstock) বৈঠকে বসেছিল আমেরিকা ও ইরান। এই ঐতিহাসিক আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কাতার এবং পাকিস্তান।
সোমবার দুই মধ্যস্থতাকারী দেশের পক্ষ থেকে একটি যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, দুই পক্ষই আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়েছে। এই সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও এই আলোচনা চলবে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও বৈঠক নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়ে দাবি করেছেন, সুইৎজ্যারল্যান্ডের এই বৈঠক থেকে ইরানের একাধিক বড় প্রাপ্তি ঘটেছে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও ইরানের ক্ষোভ
অবশ্য এই আলোচনার পথ সম্পূর্ণ মসৃণ ছিল না। বৈঠকের শুরুতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, লেবাননে ইরান যদি তাদের ‘বন্ধু’ সংগঠনকে (হিজবুল্লাহ) নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারে, তবে আমেরিকা আবারও হামলা চালাবে। এমনকি ইরানিদের আর নিজেদের দেশ বলে কিছু থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ইরানের প্রতিনিধি দল। প্রতিবাদে বিদেশমন্ত্রী আরাঘচি সহ ইরানি কূটনীতিকরা বৈঠক কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান (Walkout)। তবে কাতার ও পাকিস্তানের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়। বৈঠক শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর থেকে আংশিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই বড় ঘোষণাটি এল।

