বার্ধক্যজনিত সমস্যার কথা এতদিন মূলত বারাণসীর প্রসঙ্গেই উচ্চারিত হতো, কিন্তু বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সেই একই সংকটের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে তিলোত্তমা। কর্মক্ষম যুবশক্তির সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বয়স্কদের সংখ্যাধিক্য—এই দুইয়ের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় কলকাতার ভবিষ্যৎ অর্থনীতি এক বড় ঝুঁকির মুখে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা: বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ
ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতার অধ্যাপক শাশ্বত ঘোষের মতে, কলকাতার প্রজনন হার বর্তমানে ০.৮-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে, যা কার্যত সর্বনিম্ন স্তর। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সত্তরের দশকের গোড়া থেকেই এই হার ২.১-এর নিচে নেমেছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রবণতা বজায় থাকায় শহরটি এখন জনতাত্ত্বিক হ্রাসের মুখে। অথচ, এই জরুরি জনতাত্ত্বিক ইস্যু নিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে কোনো নীতি-নির্ধারণী আলোচনা বা সচেতনতা নেই বললেই চলে।
স্বেচ্ছায় সন্তানহীনতার পেছনের কারণসমূহ
কেন দম্পতিরা সন্তান গ্রহণে অনিচ্ছুক বা অসমর্থ? সমাজতাত্ত্বিক ও গবেষকদের মতে, এর পেছনে বেশ কিছু আর্থ-সামাজিক কারণ দায়ী:
- পেশাগত অগ্রাধিকার: উচ্চ নারীশিক্ষা, ক্যারিয়ার সচেতনতা, ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে দম্পতিরা এখন অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
- আর্থিক অনিশ্চয়তা: জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উচ্চমূল্য সন্তান লালন-পালনকে অনেক দম্পতির কাছে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ করে তুলেছে।
- দেরিতে বিবাহ: পেশাগত ব্যস্ততায় বিয়ের বয়স বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বেশি বয়সে সন্তান নেওয়ার প্রচেষ্টায় ফার্টিলিটি সংক্রান্ত জটিলতা বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রতিকারের পথ
বিশ্বের অনেক দেশই এই সংকটের মোকাবিলায় বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:
- ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়া: জাপান, ইতালি বা হাঙ্গেরির মতো দেশগুলিতে সন্তান পালনে দীর্ঘ ছুটি, কর ছাড়, পরিষেবায় ভর্তুকি এবং সরাসরি নগদ অনুদান দেওয়ার মতো প্রকল্প চালু রয়েছে।
- প্রতিবেশী রাজ্য: অন্ধ্রপ্রদেশের উদাহরণ টেনে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেখানে প্রজনন হার ১.৫-এ নেমে আসতেই মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু দ্বিতীয় বা তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিলে নগদ অর্থ ও নিখরচায় শিক্ষার মতো জনহিতকর প্রকল্প ঘোষণা করেছেন।
ভবিষ্যৎ পরিণাম ও আশঙ্কা
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে যদি রাজ্যে শিল্পায়ন বা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়, তবে কাজ করার মতো স্থানীয় লোক পাওয়া কঠিন হবে। তখন পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকে কর্মী আমদানি করতে হতে পারে। এছাড়া, কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমে গেলে বয়স্কদের পেনশন ও স্বাস্থ্য পরিষেবার বোঝা বর্তমান প্রজন্মের ওপর বহুগুণ বেড়ে যাবে। রাজনৈতিক দলগুলি বর্তমানে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিলেও, ভবিষ্যতের জনতাত্ত্বিক শূন্যতা পূরণে দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট।
জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য সরকারি পর্যায়ে এখনই আলাপ-আলোচনা ও নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, নতুবা অদূর ভবিষ্যতে কলকাতাকে এক ‘বয়স্কদের শহরে’ পরিণত হওয়ার নিয়তি মেনে নিতে হবে।

