আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্তে কর্তব্যে চরম গাফিলতি এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে কলকাতা পুলিশের তৎকালীন তিন শীর্ষ আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করল রাজ্য সরকার। শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক প্রশাসনিক বৈঠকে এই কড়া সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন।
সাসপেন্ড হওয়া আধিকারিকদের মধ্যে রয়েছেন কলকাতা পুলিশের তৎকালীন কমিশনার বিনীত গোয়েল, তৎকালীন ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং তৎকালীন ডিসি (নর্থ) অভিষেক গুপ্ত। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই আইপিএস আধিকারিকরা মূল অপরাধের তদন্ত করছেন না, বরং ঘটনার সময় তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রশাসনিক গাফিলতি ও প্রমাণ নষ্টের গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে এই বিভাগীয় পদক্ষেপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাও খতিয়ে দেখার ঘোষণা করেছেন তিনি।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর ‘ভূমিকা’ও তদন্তের আওতায়
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠকে জানান:
“রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী হিসাবে আমি ঘোষণা করছি, ওই সময়ে যা ঘটেছিল, তা মিসহ্যান্ডেলিং করা এবং যথাযথ ভাবে এফআইআর করে পদক্ষেপ করার মতো প্রাথমিক বিষয়ে চরম গাফিলতি ছিল। সবচেয়ে বড় অভিযোগ, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নির্যাতিতার পরিবারকে রাজ্য সরকারের হয়ে টাকা দিতে চেয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন পুলিশ অফিসাররা।”
২০২৪ সালের অগস্টে ঘটনার পর থেকেই এই তিন অফিসারের অপসারণের দাবিতে সরব হয়েছিলেন আন্দোলনকারী চিকিৎসক ও সাধারণ নাগরিকরা। তবে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সেই দাবিতে কর্ণপাত করেনি। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তদানীন্তন সরকারের সদিচ্ছা ও ভূমিকাও এই তদন্তের আওতাভুক্ত থাকবে।
বিনীত গোয়েলের ভূমিকা ও একাধিক বিতর্ক
১৯৯৪ ব্যাচের আইপিএস অফিসার বিনীত গোয়েল ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন। আরজি কর কাণ্ডের পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ ওঠে:
- সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘন: ২০২৪ সালের ১০ অগস্ট সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশ উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে নির্যাতিতার নাম প্রকাশ করেন বিনীত, যার জন্য ২০২৫ সালের জুলাই মাসে হাই কোর্টে নিঃশর্ত ক্ষমা চান তিনি।
- ‘রাতদখল’ কর্মসূচিতে ব্যর্থতা: ১৪ অগস্ট রাতে আরজি কর হাসপাতালে দুষ্কৃতী হামলার ঘটনা ঘটে। জরুরি বিভাগ ও চিকিৎসকদের মঞ্চ ভাঙচুর করা হলেও পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল। পরে বিনীত নিজেই পুলিশের গোয়েন্দা ও রণকৌশলগত ব্যর্থতা স্বীকার করেন।
- মূল অভিযুক্তের বয়ান ও রাজ্যপালের অভিযোগ: ধৃত সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায় আদালতে দাবি করে যে, বিনীত গোয়েলসহ শীর্ষ কর্তারা তাকে ফাঁসিয়েছেন। পাশাপাশি, তৎকালীন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসও বিনীত ও ইন্দিরার বিরুদ্ধে রাজভবনের পদকে কালঙ্কিত করা এবং গুজব ছড়ানোর অভিযোগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে নালিশ জানিয়েছিলেন।
বর্তমানে বিনীত গোয়েল রাজ্য পুলিশের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ (আইবি)-এর ডিজি পদে কর্মরত ছিলেন।
সেমিনার হলের ‘সুরক্ষা’ ও ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা
তৎকালীন ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় (বর্তমানে সিআইডি-র স্পেশ্যাল সুপারিনটেনডেন্ট) সেমিনার হলের নিরাপত্তা ও ভিডিও বিতর্ক নিয়ে কাঠগড়ায় ওঠেন।
ঘটনার পর একটি ৪৩ সেকেন্ডের ভিডিও প্রকাশ্যে আসে, যেখানে দেখা যায় অপরাধ স্থলের কাছেই প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের আপ্তসহায়ক, আইনজীবী এবং বহিরাগতসহ প্রায় ৩০ জন উপস্থিত ছিলেন। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, সেমিনার হলের মূল অংশটি সুরক্ষিত ছিল এবং বাকি অংশে পিজিটি পড়ুয়ারা ছিলেন। তবে সিবিআই সুপ্রিম কোর্টে জানায় যে, ঘটনাস্থলের ‘চরিত্র বদল’ করা হয়েছিল। সন্দীপ ঘোষের আইনজীবীর উপস্থিতি নিয়ে ইন্দিরার দেওয়া সাফাই এবং প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে কলকাতা পুলিশের মামলা করার ঘটনা সে সময় তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করে।
ডিসি নর্থ অভিষেক ও দ্রুত শবদাহের ‘অতিসক্রিয়তা’
আরজি কর হাসপাতালটি টালা থানার অন্তর্গত হওয়ায় তৎকালীন ডিসি (নর্থ) অভিষেক গুপ্তের (বর্তমানে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলসের ডিআইজি) ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
- দেরিতে পদক্ষেপ ও এফআইআর: সিবিআই তদন্তে জানা যায়, টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডল (যাঁকে পরবর্তীতে সিআইডি/সিবিআই গ্রেফতার করে) ঘটনার খবর পেয়েও এক ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছান। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা মেনে ভিডিওগ্রাফিও করা হয়নি।
- তড়িঘড়ি শবদাহের অভিযোগ: নির্যাতিতার পরিবার প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছে যে, দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের দাবি থাকা সত্ত্বেও পুলিশ অত্যন্ত তড়িঘড়ি এবং সক্রিয় হয়ে দেহ দাহ করায়। অভিযোগ রয়েছে, এই অতিসক্রিয়তার মূল কেন্দ্রে ছিলেন অভিষেক গুপ্ত নিজেই। এছাড়া নির্যাতিতার পরিবারকে টাকা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগেও তাঁর নাম জড়ায়।
রাজ্য প্রশাসনের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের পর আরজি কর কাণ্ডে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে নতুন মোড় আসতে চলেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

