আদি বিজেপি থেকে প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক, পরিচারিকা থেকে শিক্ষাবিদ, এক নজরে রাজ্যের ৩৫ জন নতুন মন্ত্রীর পরিচয়

আদি বিজেপি থেকে প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক, পরিচারিকা থেকে শিক্ষাবিদ, এক নজরে রাজ্যের ৩৫ জন নতুন মন্ত্রীর পরিচয়

অবশেষে পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) সরকার। গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি পাঁচ মন্ত্রী—দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনিয়া এবং ক্ষুদিরাম টুডু শপথ নিয়েছিলেন। সোমবার (১ জুন) রাজভবনে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার প্রথম সম্প্রসারণ ঘটিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হলো আরও ৩৫ জন নতুন মুখকে।

এর মধ্যে ১৩ জন পূর্ণমন্ত্রী, ৩ জন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। নতুন ৩৫ জন সদস্য যুক্ত হওয়ায় শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভার মোট সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৪১।

নতুন এই মন্ত্রিসভায় পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির আদি ও নব্য নেতৃত্বের মেলবন্ধন ঘটার পাশাপাশি জাতিগত, ভৌগোলিক ও পেশাগত ভারসাম্যের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের সম্পূর্ণ তালিকা ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিচে তুলে ধরা হলো:

পূর্ণমন্ত্রী (১৩ জন)

১. তাপস রায় (মানিকতলা): আশির দশকের শেষ পর্বে ছাত্র পরিষদের রাজনীতি থেকে উত্থান। কংগ্রেস ও তৃণমূল হয়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া এই প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতা উত্তর কলকাতা থেকে একমাত্র পূর্ণমন্ত্রী। অতীতে তৃণমূল সরকারের মন্ত্রিসভাতেও ছিলেন তিনি। ২. মনোজ ওরাওঁ (কুমারগ্রাম): উত্তরবঙ্গের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী তরুণ নেতা এবং এই নিয়ে দু’বারের বিধায়ক। ৩. অর্জুন সিংহ (নোয়াপাড়া): ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলসহ কলকাতা ও লাগোয়া অঞ্চলের হিন্দিভাষী সমাজে অত্যন্ত প্রভাবশালী মুখ। ২০১৯ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপির সাংসদ হন, মাঝে তৃণমূলে ফিরলেও ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে ফের বিজেপিতে প্রত্যাবর্তন করেন। ৪. গৌরীশঙ্কর ঘোষ (মুর্শিদাবাদ): মুর্শিদাবাদ জেলা বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি এবং দলের ‘আদি বিজেপি’ শিবিরের বিশ্বস্ত মুখ। তিনি এই নিয়ে দু’বারের বিধায়ক। ৫. দীপক বর্মণ (ফালাকাটা): দলের প্রাক্তন রাজ্য সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সহ-সভাপতি। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) অত্যন্ত পছন্দের এবং ‘আদি বিজেপি’ হিসেবে পরিচিত এই নেতা দু’বারের বিধায়ক। ৬. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (বিধাননগর): পেশায় বিশিষ্ট চিকিৎসক। বিধাননগরের মতো উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত প্রধান এলাকা থেকে জয়ী হয়েছেন। দলে নতুন হলেও অত্যন্ত দ্রুত পার্টি লাইনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। ৭. অরূপকুমার দাস (কাঁথি দক্ষিণ): মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুর থেকে একমাত্র পূর্ণমন্ত্রী। কাঁথি দক্ষিণ আসনের দু’বারের বিজেপি বিধায়ক অরূপ অধিকারী পরিবারের অত্যন্ত অনুগত ও ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ৮. স্বপন দাশগুপ্ত (রাসবিহারী): প্রাক্তন প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য। দলের ‘সুশীল মুখ’ হিসেবে পরিচিত স্বপন দাশগুপ্ত ব্যবসায়ী মহল, উচ্চবিত্ত শ্রেণী এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের অত্যন্ত পছন্দের পাত্র। দক্ষিণ কলকাতা থেকে শুভেন্দু অধিকারী ছাড়া তিনিই একমাত্র পূর্ণমন্ত্রী। ৯. জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় (সিউড়ি): আরএসএসের ‘তৃতীয় বর্ষ প্রশিক্ষিত স্বয়ংসেবক’। ২০২১ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক পদের পর বর্তমানে রাজ্য সহ-সভাপতি। পর পর দু’বার নিজের শহর সিউড়ি থেকে লড়াই করে এবার জয়ী হন। ১০. কল্যাণ চক্রবর্তী (খড়দহ): বিশিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষক। দীর্ঘদিন সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত সঙ্ঘের পছন্দের এই নেতা ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে বাঙালি-অবাঙালি ভারসাম্যের প্রতীক। অবাঙালি অর্জুন সিংহের পাশাপাশি ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত এই বাঙালি মুখকে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে। ১১. শঙ্কর ঘোষ (শিলিগুড়ি): সিপিএমের প্রাক্তন এই যুবনেতা বিধানসভা ও নিজের নির্বাচনী ক্ষেত্র শিলিগুড়িতে সমান সক্রিয়। অন্যান্য দল থেকে বিজেপিতে আসা নেতাদের যে মন্ত্রিসভায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, দু’বারের এই বিধায়ক তারই প্রমাণ। ১২. অজয় পোদ্দার (কুলটি): পশ্চিম বর্ধমানের হিন্দিভাষী ও অবাঙালি সমাজের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি এবং এই নিয়ে দু’বারের বিধায়ক। ১৩. দুধকুমার মণ্ডল (ময়ূরেশ্বর): শুভেন্দু মন্ত্রিসভায় ‘আদি বিজেপির’ তালিকায় আদিতম নাম। রামমন্দির আন্দোলনের সূচনা লগ্নে অযোধ্যায় কারসেবায় যোগ দিয়েছিলেন এবং বীরভূমের মতো কঠিন রাজনৈতিক মাটিতে দীর্ঘদিন ধরে দলের ঝাণ্ডা ধরে রেখেছেন।

স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী (৩ জন)

১. মালতি রাভা রায় (তুফানগঞ্জ): উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সম্প্রদায়ের লড়াকু নেত্রী এবং কোচবিহার জেলা কমিটির প্রাক্তন সভানেত্রী। ‘আদি বিজেপি’ শিবিরের এই নেত্রী দু’বারের বিধায়ক। ২. রাজেশ মাহাতো (গোপীবল্লভপুর): জঙ্গলমহলের কুড়মি সমাজের প্রভাবশালী নেতা। কুড়মি জনগোষ্ঠীর সংরক্ষণের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। ৩. ইন্দ্রনীল খাঁ (বেহালা পশ্চিম): পেশায় তরুণ চিকিৎসক এবং বিজেপির যুবমোর্চার রাজ্য সভাপতি। শুভেন্দু মন্ত্রিসভায় যুবসমাজ ও উচ্চশিক্ষিত অংশের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে আনা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী (১৯ জন)

১. অশোক দিন্ডা (ময়না): ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন পেসার। ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়ে প্রথমবার বিধায়ক হন, এবার জয়ের ব্যবধান আরও বাড়িয়েছেন। জেলা রাজনীতিতে শুভেন্দুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ২. কৌশিক চৌধুরী (রায়গঞ্জ): উত্তরবঙ্গের রায়গঞ্জ থেকে নির্বাচিত প্রথম বারের বিধায়ক, আরএসএস-এর অত্যন্ত পছন্দের পাত্র হিসেবে পরিচিত। ৩. জুয়েল মুর্মু (হবিবপুর): উপনির্বাচনসহ মোট তিন বারের বিধায়ক। একদা রাজ্য বিজেপির জনজাতি মোর্চার সভাপতির দায়িত্ব পালন করা অন্যতম আদিবাসী মুখ। ৪. হরেকৃষ্ণ বেরা (তমলুক): পেশায় চিকিৎসক। ২০২১ সালে তমলুক আসনে পরাস্ত হলেও ২০২৬-এর নির্বাচনে জয়ী হয়ে মন্ত্রিত্ব পেলেন। ৫. শান্তনু প্রামাণিক (ভগবানপুর): পেশায় শিক্ষক। গতবার খেজুরি আসন থেকে জিতলেও এবার ভগবানপুর থেকে আসন বদলে জয় পেয়েছেন। ৬. মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র (বর্ধমান দক্ষিণ): রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ও পেশায় আইনজীবী। এবারই প্রথম বারের বিধায়ক হিসেবে বিধানসভায় এসেছেন। ৭. উমেশ রাই (হাওড়া উত্তর): হাওড়ার হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠীর জনপ্রিয় নেতা ও আদি বিজেপি কর্মী। গতবার পরাস্ত হলেও এবার জয়ী হয়েই প্রতিমন্ত্রীর পদ পেলেন। ৮. পূর্ণিমা চক্রবর্তী (শ্যামপুকুর): অবাঙালি পরিবারের কন্যা এবং বাঙালি পরিবারের বধূ। এবারই প্রথম ভোটে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের হেভিওয়েট মন্ত্রী শশী পাঁজাকে পরাজিত করে চমক দিয়েছেন। ৯. ভাস্কর ভট্টাচার্য (শ্রীরামপুর): আদি বিজেপির এই নেতা পেশায় আইনজীবী। দলের হুগলি জেলা সভাপতির দায়িত্ব সামলানো ভাস্কর এবারই প্রথম বিধায়ক হয়েছেন। ১০. দিবাকর ঘরামি (সোনামুখী): বাঁকুড়া জেলার ওই কেন্দ্র থেকে পর পর দু’বার জয়ী তফশিলি সম্প্রদায়ের বিজেপি বিধায়ক। ১১. নদিয়ারচাঁদ বাউড়ি (পারা): পুরুলিয়া জেলার আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর অন্যতম নেতা এবং পর পর দু’বার জয়ী বিধায়ক। ১২. গার্গী দাস ঘোষ (কান্দি): প্রথম বার বিধায়ক হয়েই মন্ত্রিত্ব পেলেন। ভোটে হারিয়েছেন প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা অপূর্ব সরকারকে। তাঁর মা প্রয়াত ছায়া ঘোষ মুর্শিদাবাদের প্রথম সারির ফরওয়ার্ড ব্লক নেত্রী ও বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘদিনের মন্ত্রী ছিলেন। ১৩. অমিয় কিস্কু (নয়াগ্রাম): জঙ্গলমহলের এই আদিবাসী নেতা এবারই প্রথম প্রার্থী হয়ে বিধায়ক হয়েছেন এবং প্রথমবারেই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন। ১৪. কলিতা মাজি (আউশগ্রাম): পূর্ব বর্ধমানের দলিত সমাজের প্রতিনিধি এবং পেশায় গৃহ পরিচারিকা। পর পর দু’বার বিজেপির টিকিটে লড়াই করে এবার জয়ী হন। তফসিলি মহিলা সমাজের মুখ হিসেবে তাঁকে মন্ত্রিসভায় আনা হয়েছে। ১৫. বিরাজ বিশ্বাস (করণদিঘি): সঙ্ঘের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি (ABVP) থেকে উঠে আসা পেশায় এই আইনজীবী পশ্চিমবঙ্গের কনিষ্ঠতম বিধায়ক এবং শুভেন্দু মন্ত্রিসভার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। ১৬. সুমনা সরকার (বলাগড়): একদা তৃণমূলের টিকিটে জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতি ছিলেন। পরবর্তীতে মুকুল রায়ের হাত ধরে বিজেপিতে যোগদান করেন এবং এবার বলাগড় থেকে জয়ী হন। ১৭. আনন্দময় বর্মণ (মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি): রাজবংশী সমাজের এই নেতা গত দু’বারের বিধায়ক। ফলতার পুনর্নির্বাচনের ফলাফল বাদ দিলে আনন্দময় এবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। ১৮. বিশাল লামা (কালচিনি): আলিপুরদুয়ার জেলা বিজেপির প্রথম সারির নেতা ও দু’বারের বিধায়ক। ডুয়ার্স অঞ্চলের আদিবাসী ও নেপালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অত্যন্ত সক্রিয় মুখ। ১৯. দীপঙ্কর جانا (কাকদ্বীপ): তৃণমূলের অভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় বিজেপির অন্যতম প্রধান লড়াকু মুখ। গতবার হারলেও এবার কাকদ্বীপ থেকে জয়ী হয়েছেন।

‘সোনার বাংলা’ গড়ার আহ্বান অমিত শাহের

সোমবার নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণের পর সমাজমাধ্যমে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

অমিত শাহের বার্তা: “পশ্চিমবঙ্গে মন্ত্রিপদের শপথ গ্রহণকারী সকল মন্ত্রীগণকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। আমার পূর্ণ বিশ্বাস, আপনারা সকলেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোদীজির দিকনির্দেশনা এবং শ্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয়ের নেতৃত্বে গঠিত ডাবল ইঞ্জিন সরকারের অংশ হিসেবে নিষ্ঠা, সমর্পণ ও জনসেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করবেন ও ‘সোনার বাংলা’ গড়ার সংকল্প বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.