ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে ১৫০ কোটিরও বেশি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, সরকারি বরাত বণ্টনে তিন সংস্থার একচেটিয়া আধিপত্যের হদিস

ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে ১৫০ কোটিরও বেশি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, সরকারি বরাত বণ্টনে তিন সংস্থার একচেটিয়া আধিপত্যের হদিস

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে দীর্ঘদিন তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্বে ছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। পরবর্তী সময়ে পর্যটন দফতরের অতিরিক্ত দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। তদন্তকারীদের দাবি, তাঁর মন্ত্রিত্বকালে এই দুই দফতরের একাধিক সরকারি বরাত বণ্টনে তিনটি নির্দিষ্ট সংস্থার একচেটিয়া আধিপত্যের প্রমাণ মিলেছে। সরকারি দরপত্র সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখে একের পর এক অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। ইউনেস্কোর লোগো ব্যবহার করে দুর্গাপুজো দেখানোর নামে চড়া দামে পাস বিক্রিতে দুর্নীতির অভিযোগে সম্প্রতি ইন্দ্রনীলকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। তবে তদন্তে আরও একাধিক আর্থিক অনিয়মের হদিস মিলেছে বলে আদালতে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। সেই তালিকায় রয়েছে সরকারি বরাত বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগও।

তৃণমূল সরকারের আমলে তথ্য-সংস্কৃতি এবং পর্যটন দফতরের বিভিন্ন বছরের সরকারি বরাত সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করেছে আনন্দবাজার ডট কম। সেই নথি থেকেই উঠে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। উদাহরণ হিসেবে রয়েছে ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের তরফে প্রকাশিত চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীপুজো আয়োজনের বরাত। সরকারি নথি অনুযায়ী, এই দরপত্রে অংশ নিয়েছিল তিনটি সংস্থা। ২৯ অক্টোবর দরপত্র খোলার পর দেখা যায়, প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে একটি সংস্থার আবেদন বাতিল হয়েছে। বাকি দু’টির মধ্যে ৪ লক্ষ ৪৫ হাজার ১১৫ টাকা সর্বনিম্ন দর দিয়ে একটি সংস্থা বরাত পায়।

এর পরের উদাহরণ রাজ্য সরকারের উদ্যোগে ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত ‘রাজ্য দিবস’ উদ্‌যাপন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এই অনুষ্ঠানের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল তথ্য-সংস্কৃতি দফতর। সেখানেও অংশ নিয়েছিল জগদ্ধাত্রীপুজোর বরাতে অংশগ্রহণকারী সেই তিনটি সংস্থা। আগের দরপত্রে দ্বিতীয় স্থান পাওয়া সংস্থাটি এ ক্ষেত্রে প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকার কাজের বরাত পায়।

একই ছবি দেখা গিয়েছে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আয়োজিত বড়িশা পৌষ উৎসবের ক্ষেত্রেও। ওই উৎসবের জন্য তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের ডাকা দরপত্রে অংশ নিয়েছিল সেই তিন সংস্থাই। চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীপুজোর বরাতে যে সংস্থার আবেদন প্রক্রিয়াগত কারণে বাতিল হয়েছিল, বড়িশা পৌষ উৎসবের ক্ষেত্রে সেই সংস্থাই প্রায় ৩৯ লক্ষ টাকার কাজের বরাত পায়।

দ্বিতীয় মমতা সরকারের আমল থেকে প্রায় ন’বছর তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্বে ছিলেন ইন্দ্রনীল। ২০২৩ সাল থেকে শেষ তিন বছর পর্যটন দফতরের অতিরিক্ত দায়িত্বও সামলেছেন তিনি। তদন্তকারীরা পর্যটন দফতরের ওই সময়ের বিভিন্ন সরকারি বরাতের নথি খতিয়ে দেখতে গিয়ে সেখানেও একই তিনটি সংস্থার উপস্থিতি পেয়েছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আয়োজিত ‘বিষ্ণুপুর মিউজ়িক ফেস্টিভ্যাল’-এর জন্য পর্যটন দফতরের ডাকা দরপত্রেও অংশ নিয়েছিল ওই তিন সংস্থা। তাদের মধ্যে একটি সংস্থা প্রায় ৮৫ লক্ষ টাকার কাজের বরাত পায়।

তদন্তকারীদের দাবি, মেলা, উৎসব-সহ বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানের আয়োজনের জন্য তথ্য-সংস্কৃতি ও পর্যটন দফতরের প্রায় ৮০ শতাংশ দরপত্রে এই তিনটি সংস্থারই উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। রাজ্যের অন্য কোনও সংস্থা কেন নিয়মিত ভাবে এই দরপত্রগুলিতে অংশ নেয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অথচ তদন্তকারীদের বক্তব্য, কলকাতায় এই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করার মতো আরও বহু ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা রয়েছে।

তদন্তকারীদের দাবি, ওই তিনটি সংস্থার সঙ্গে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীলের সরাসরি যোগসূত্র এখনও পাওয়া যায়নি। তবে এই তিন সংস্থার সঙ্গেই এই মামলায় গ্রেফতার হওয়া ধ্রুবজ্যোতি বসু ওরফে শুভ, তাঁর সংস্থা ‘মাস আর্ট’ এবং প্রাক্তন মন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের আর্থিক লেনদেনের সূত্র মিলেছে। তদন্তকারীদের অনুমান, গত কয়েক বছরে ওই তিন সংস্থার একচেটিয়া আধিপত্যের নেপথ্যে ইন্দ্রনীলের রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে থাকতে পারে। সেই প্রভাব খাটিয়েই ঘুরপথে তিনি আর্থিক ভাবে লাভবান হয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আদালতে সরকারি বরাত দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরার পাশাপাশি ওই তিন সংস্থার আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরে ইতিমধ্যেই ২৮টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেন বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা পুলিশ।

তদন্তে উঠে আসা তিনটি সংস্থার ঠিকানা রাজডাঙা, হাজরা রোড এবং দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটে। প্রাথমিক ভাবে টেন্ডার সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখে তদন্তকারীদের দাবি, ২০২৫ সাল পর্যন্ত রাজডাঙার সংস্থাটি তথ্য-সংস্কৃতি দফতর থেকে প্রায় ৬০ কোটি টাকার কাজের বরাত পেয়েছে। পর্যটন দফতর থেকে পাওয়া বরাতের অর্থমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। অন্য দিকে, হাজরা রোডের সংস্থাটি একই সময়ে তথ্য-সংস্কৃতি দফতর থেকে প্রায় ৬১ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। পর্যটন দফতর থেকে পাওয়া বরাতের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটের সংস্থাটি। তথ্য-সংস্কৃতি দফতর থেকে তারা প্রায় ২০ কোটি টাকার কাজের বরাত পেয়েছে। পর্যটন দফতর থেকে পাওয়া কাজের অর্থমূল্য ১ কোটি টাকারও কম।

শুক্রবার ফের কসবার বাড়িতে তল্লাশি চালান কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দারা। পুলিশের দাবি, কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথির খোঁজেই এই তল্লাশি চালানো হয়েছে। তদন্তকারীদের ইঙ্গিত, এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রাক্তন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের অঙ্ক ১৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তদন্ত যত এগোবে, সেই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে বলেও মনে করছেন তাঁরা।

তদন্তকারীদের একাংশের দাবি, শুধু একচেটিয়া ভাবে সরকারি বরাত পাওয়াই নয়, ওই তিনটি সংস্থার জমা দেওয়া দরপত্রের কয়েকটি ক্ষেত্রে বাজারদরের তুলনায় বেশি দামও উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, প্রতিটি সরকারি দরপত্র অনুমোদনের ক্ষেত্রে দফতরের বিভিন্ন পদমর্যাদার আধিকারিকদের ভূমিকা থাকে। ফলে কী ভাবে ওই তিনটি সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক সরকারি কাজের বরাত পেয়েছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট সময়ের দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে তদন্তকারীদের।

অন্য দিকে, প্রাক্তন মন্ত্রীর কন্যা পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, তাঁর সংস্থার সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন ইন্দ্রনীল নিজেই। কোথা থেকে টাকা এসেছে বা কী ভাবে আর্থিক লেনদেন হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর কোনও ধারণা নেই বলেও দাবি করেছেন তিনি।

এদিকে, সরকারি পদে থেকে দুর্নীতি করার অভিযোগে ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে দুর্নীতিদমন আইনের নির্দিষ্ট ধারা যুক্ত করার বিষয়ে আইনি পরামর্শ নিচ্ছে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সরকারি বরাত বণ্টনে অনিয়মের আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.