সিঙ্গুরে ফিরছে শিল্প, অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার কথা ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

সিঙ্গুরে ফিরছে শিল্প, অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার কথা ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

হুগলির সিঙ্গুরে ফের নতুন করে শিল্পায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে রাজ্য সরকার। ভারী বাণিজ্যিক যানবাহন প্রস্তুতকারী স্বনামধন্য সংস্থা অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায় আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার নিউটাউনে রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি প্রকাশের পর এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এই ঘোষণা করেন।

গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জনসভা করেন। এর জবাবে সিঙ্গুরের অদূরে পাল্টা সভা করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে নির্বাচনে সিঙ্গুর কেন্দ্রে পরাজিত হয় তাঁর দল। রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই সিঙ্গুর ঘিরে শিল্পমহলের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় আগেই সিঙ্গুর নিয়ে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। এবার খোদ মুখ্যমন্ত্রীর বার্তায় সেখানে নতুন করে শিল্পের আশা জাগল।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সিঙ্গুরে টাটা গোষ্ঠীর ‘ন্যানো’ গাড়ি প্রকল্পের মাধ্যমে শিল্পায়নের সূচনা করেছিলেন। তবে তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণের অভিযোগে বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। টানা আন্দোলনের মুখে একপর্যায়ে টাটা গোষ্ঠী সিঙ্গুর থেকে প্রকল্প গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফেরত দেন এবং সিঙ্গুরের মাটিতে স্বয়ং উপস্থিত হয়ে ধানের বীজ ছড়িয়ে জমি হস্তান্তরের সূচনা করেছিলেন।

বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠান থেকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট আশ্বাস দিয়ে জানান, অতীত জমানার মতো জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে রক্তপাতের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। তিনি বলেন, “শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে কৃষকদের ওপর গুলি চালানো হবে না।” রাজ্যের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে তিনি জানান, বর্তমানে রাজ্যে প্রায় দুই কোটি শিক্ষিত বেকার রয়েছেন এবং কাজের খোঁজে প্রায় ৭০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছেন। আদানি গোষ্ঠীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “তাজপুরে রাজ্য সরকারের নিজস্ব এক একর জমিও ছিল না বলে আদানি গোষ্ঠী আমাদের জানিয়েছিল, ফলে সেখানে বন্দর তৈরি সম্ভব হয়নি। তবে সিঙ্গুরে আমরা নিশ্চয়ই কিছু একটা করব। অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়েছে। তবে আমরা কেবল সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করে লোকদেখানো চমক দিতে চাই না। বিগত সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন করলেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আমরা সেই পথে হাঁটব না।”

নয়া শিল্পনীতির বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবহারে বিশেষ সুযোগ-সুবিধার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বৃহৎ শিল্পের ক্ষেত্রে পৃথক প্যাকেজের মাধ্যমে সংস্থাগুলিকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হবে। মহিলা কর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা মিলবে এবং প্রয়োজন অনুসারে কর্মরত মহিলাদের জন্য হস্টেল নির্মাণে রাজ্য সরকার অনুদান দেবে। এছাড়া উৎপাদনকারী ইউনিটগুলির ক্ষেত্রে রাজ্য জিএসটি (SGST)-তে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আরও বলেন, “বিগত সরকারের জমানায় চিত্তরঞ্জন ও হলদিয়া শিল্পাঞ্চল সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বাংলায় আর কোনো সিন্ডিকেট বা তোলাবাজি বরদাস্ত করা হবে না। নির্বাচনী সঙ্কল্পপত্রে প্রদত্ত প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করা হবে।”

ঘোষিত নতুন শিল্পনীতিতে হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা এবং স্ট্যাম্প ডিউটিতে ১০০ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি, বৃহৎ ও পরিষেবা— এই চার ক্ষেত্রকেই সহায়তার আওতাভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। অনগ্রসর অঞ্চলে কারখানা স্থাপন করলে বাড়তি উৎসাহ ভাতা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি, বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পের পুনরুজ্জীবন, সবুজ বিদ্যুৎ এবং গবেষণা-উন্নয়নমূলক কাজে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে ১৫টি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এদিনের বৈঠকে পণ্যবাহী যানবাহনের অতিরিক্ত পন্য পরিবহন (ওভারলোডিং) বন্ধের জন্য শিল্পপতিদের প্রতি আবেদন জানান মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি রাজ্যে জমতে থাকা বিপুল পরিমাণ বকেয়া উৎসাহ ভাতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি আশ্বাস দেন, রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেই তা মিটিয়ে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এই মুহূর্তে বাস্তবসম্মত নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.