বিশ্বের একাধিক বড় শেয়ারবাজারে যখন পতনের ঝড়, তখন সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি ভারতের শেয়ারবাজারে। আমেরিকা, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারসূচকগুলি উল্লেখযোগ্য ভাবে নিম্নমুখী হলেও ঊর্ধ্বমুখী ভারতের দালাল স্ট্রিট। দীপাবলির সপ্তাহে ভারতীয় বাজারের এই উত্থানে লাভের মুখ দেখছেন লগ্নিকারীদের একাংশ। শুক্রবারের লেনদেন শেষে সেনসেক্স ও নিফটি—দুই প্রধান সূচকেই বড় অঙ্কের বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গিয়েছে।
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর বাজার বন্ধের সময় বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) সেনসেক্স ১,৭১৮.০২ পয়েন্ট বেড়ে পৌঁছয় ৮১,০২৮.০২ পয়েন্টে। শতাংশের হিসাবে বৃদ্ধি ২.১৭ শতাংশ। এ দিন ৭৯,৪১৩.৬৬ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করেছিল এই সূচক। প্রায় ন’মাস পর ফের ৮১ হাজারের গণ্ডি পার করল সেনসেক্স। উল্লেখযোগ্য ভাবে, ২ থেকে ৬ নভেম্বরের মধ্যে ভারতীয় শেয়ারবাজারে আট শতাংশেরও বেশি উত্থান হয়েছে।
অন্য দিকে, ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (এনএসই) নিফটি ৫০-ও এ দিন ৪৯৩.৭৫ পয়েন্ট বেড়েছে। ফলে ২.০১ শতাংশ বৃদ্ধির পর সূচকটি দাঁড়িয়েছে ২৫,০৩০.৩৫ পয়েন্টে। বাজারের এই অভাবনীয় উত্থানের নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় শেয়ারবাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম কারণ বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক লগ্নিকারীদের (এফআইআই) প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় বাজার থেকে দূরে থাকার পর ফের লগ্নি বাড়াতে শুরু করেছেন তাঁরা। ব্রোকারেজ সংস্থাগুলির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর বিএসই ও এনএসই মিলিয়ে বিদেশি লগ্নিকারীরা প্রায় ১৪,৯৭৪.৬৮ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। তার আগের দিন, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর তাঁদের লগ্নির পরিমাণ ছিল ৭,২৮৪.০৩ কোটি টাকা। সপ্তাহের শেষ লেনদেনের দিনেও এই প্রবণতা বজায় ছিল।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উঠে আসছে আমেরিকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির খারাপ ফলের পর সে দেশের শেয়ারবাজারে বড়সড় পতন দেখা গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য লোকসান এড়াতে ওয়াল স্ট্রিটের কিছু লগ্নিকারী ভারতীয় বাজারের দিকে ঝুঁকছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। এর ফলে বিএসই ও এনএসই-তে লগ্নির পরিমাণ বাড়ছে এবং ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে সেনসেক্স ও নিফটি।
এ ছাড়া, দেশের একাধিক বড় সংস্থার শেয়ারে ভাল রিটার্নের সম্ভাবনাও বাজারের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। বিশেষ করে মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা, টাইটান, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস), এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক, ইনফোসিস এবং এইচসিএল টেকনোলজিসের মতো লার্জ ক্যাপ সংস্থার শেয়ারের প্রতি লগ্নিকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। শুক্রবার সকালের লেনদেনে সংস্থাগুলির শেয়ারের দাম যথাক্রমে ৫.০৪, ২.৮৭, ১.৭২, ১.৭২, ১.৫৪ এবং ১.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
অন্য দিকে, ভারতের বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন আমেরিকার শেয়ারবাজারে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ন্যাসডাক কম্পোজ়িট প্রায় ছয় শতাংশ নেমে যায়। একই দিনে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের পতনের হার ছিল প্রায় চার শতাংশ। এর জেরে ওয়াল স্ট্রিট থেকে প্রায় ২.৫ লক্ষ কোটি ডলারের বাজারমূল্য উধাও হয়ে যায়। এক দিনের নিরিখে এটি অন্যতম বড় পতন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু আমেরিকাতেই নয়, এশিয়ার বাজারেও বড়সড় ধস নেমেছে। বৃহস্পতিবার জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক প্রায় পাঁচ শতাংশ কমেছে। অন্য দিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচকে পতনের পরিমাণ ছিল ৮.৮ শতাংশ।
বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতার মধ্যেও ভারতীয় শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক উত্থান বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। বিদেশি লগ্নিকারীদের প্রত্যাবর্তন, বড় সংস্থার শেয়ারে ইতিবাচক প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি—সব মিলিয়েই আপাতত চাঙ্গা দালাল স্ট্রিট।

