টলিউডে ফেডারেশনের নির্বাচন ঘিরে নতুন করে বিতর্ক দানা বাঁধল। ভোট চলাকালীনই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন কলাকুশলীদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, রাজ্যের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর প্রভাব এ বার পড়েছে টলিপাড়ার নির্বাচনেও। নাম বাদ না পড়লেও অনেকের নাম ভোটার তালিকায় নেই। ফলে ইচ্ছা থাকলেও তাঁরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি। এই পরিস্থিতিতে ফেডারেশনের ভোটকে অবৈধ বলেও দাবি করেছেন কয়েক জন কলাকুশলী।
শনিবার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় ভোট চলাকালীনই ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, পূর্বতন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখনও নিজেদের জায়গায় রয়েছেন। এমনকি, তাঁদের মধ্যে অনেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিততে চলেছেন। ফলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ফেডারেশনের অধীন মোট ২৬টি গিল্ডের নির্বাচন হচ্ছে। শনিবারের পাশাপাশি রবিবারও চলবে ভোটগ্রহণ। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই ঠিক হবে ফেডারেশনের নতুন সভাপতি কে হবেন। ভোটপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে নির্বাচন হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে এ দিন টেকনিশিয়ান স্টুডিয়ো এবং এনটি ওয়ান স্টুডিয়োর বাইরে ঘুরে দেখেন অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রুদ্রনীল ঘোষও।
নির্বাচনের ভোটার তালিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। জানা গিয়েছে, ২৬টি গিল্ড মিলিয়ে মোট ভোটার ৮০১০ জন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০০০ জনের নাম এসআইআর-এর কারণে বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পাশাপাশি, প্রায় ৩০০০ ভোটারকে অবৈধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, দু’দিনে মোট ৪০১০ জন ভোট দিতে পারবেন। যাঁরা ভোটার কার্ড কিংবা ভোটদানের জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ নথি জমা দিতে পারেননি, তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আবার, অনেকে দুটি গিল্ডের সদস্য হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী একটি গিল্ডের ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই বিতর্ক প্রসঙ্গে শাসকদলের বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ বলেন, কার নাম কেন বাদ পড়েছে, তা লেবার কমিশন বা ট্রেড ইউনিয়ন কমিশনই বলতে পারবে। তাঁর বক্তব্য, ভোটের নিয়মকানুন এবং কারা গিল্ডের কার্ড পাবেন, তা সংশ্লিষ্ট কমিশনই নির্ধারণ করেছে। অতীতে অর্থের বিনিময়ে ভুয়ো কার্ড দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে বলে দাবি করেন তিনি। রুদ্রনীলের কথায়, এই নির্বাচন অন্য নির্বাচনের থেকে আলাদা। সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না। সেই কারণেই তাঁরা স্টুডিয়োর বাইরে রয়েছেন।
অন্য দিকে, শাসকদলের আর এক বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী জানান, যাঁরা প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখনও গিল্ডের কার্ড পাননি। মিঠুন চক্রবর্তী তাঁদের কার্ড দেওয়ার এবং কাজের সুযোগ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগবে।
পাপিয়ার আরও অভিযোগ, স্বরূপ বিশ্বাসের আমলে ৮০ হাজার থেকে শুরু করে ৭ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিয়ে বেআইনি ভাবে গিল্ডের কার্ড বিক্রি করা হত। তাঁর দাবি, পূর্বতন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষ এখনও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাঁরা নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করলে কাজের পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব হবে। অন্যথায়, গুন্ডামি রুখতে বিজেপি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে জানে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ দিন টলিউডের ‘ব্যান কালচার’ নিয়েও মুখ খোলেন মিঠুন চক্রবর্তী। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, গণতান্ত্রিক পরিবেশে কারও কাজ বন্ধ করে দেওয়া যায় না। প্রত্যেকে নিজের পছন্দমতো অন্যের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। তবে কেউ কোনও ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাঁর বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরেই নানা ইস্যুতে বার বার উত্তপ্ত হয়েছে টলিপাড়া। ফেডারেশন ও ছোটপর্দার প্রযোজকদের মধ্যে বিরোধ, টেকনিশিয়ানদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ, বকেয়া পারিশ্রমিক, অতিরিক্ত সময় কাজ করানো এবং শিল্পীদের উপর চাপ সৃষ্টি করা—এমন একাধিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘থ্রেট কালচার’ এবং ‘ব্যান কালচার’ নিয়েও সরব হয়েছেন শিল্পী ও কলাকুশলীদের একাংশ। ফেডারেশনের এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেই পুরনো বিতর্কই নতুন করে সামনে এল।

