রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে গ্রেফতারের পর এ বার তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে উদ্যোগী হয়েছে পুলিশ। দুর্গাপুজোর পাস বিক্রিকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তদন্তকারীদের নজরে রয়েছেন তিনিও। পুলিশ সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই মধুছন্দাকে নোটিস পাঠিয়ে তলব করা হয়েছে। তবে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে তিনি আগাম জামিন পেয়েছেন। ফলে আপাতত তাঁকে গ্রেফতার করে হেফাজতে নেওয়ার সুযোগ নেই পুলিশের হাতে। আগাম জামিনের নির্দেশের পর কী কী আইনি বিধিনিষেধ মেনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
অভিযোগ, দুর্গাপুজোর পাস বিক্রির নামে ইন্দ্রনীল ও তাঁর স্ত্রী কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মে জড়িত। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেন খতিয়ে দেখছে পুলিশ। নজরদারিতে রয়েছে ইন্দ্রনীলের কন্যার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও। মধুছন্দা ‘মাস আর্ট’ নামে একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার পরই সংস্থাটি তৈরি হয়েছিল। তদন্তকারীদের অভিযোগ, এই সংস্থাকে সামনে রেখেই আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। প্রচারে ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে পুজোর পাস বিক্রি করা হত। সাধারণ মানুষের কাছে এমন ধারণা তৈরি করা হয়েছিল যে, সংস্থাটির সঙ্গে ইউনেস্কোর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে কিংবা এই বাণিজ্যিক কার্যকলাপে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির অনুমোদন রয়েছে। যদিও ইউনেস্কোর সঙ্গে এ ধরনের কোনও বাণিজ্যিক চুক্তি ছিল না।
ইন্দ্রনীল ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে বৌবাজার থানায় অভিযোগ দায়ের করেছিলেন জয়দীপ মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই এফআইআর দায়ের হয়। সেই এফআইআরে মধুছন্দার নামও রয়েছে। পুলিশি তদন্তের পাশাপাশি মামলাটি খতিয়ে দেখছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। ইন্দ্রনীলের একাধিক ঠিকানায় তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি তাঁকে একাধিক বার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। গত ২৮ অক্টোবর ইডি দফতরে হাজিরা দিতে গেলে সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে আদালত ইন্দ্রনীলকে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয়।
গ্রেফতারির আগে আগাম জামিনের আবেদন জানিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ইন্দ্রনীল ও মধুছন্দা। তবে আদালত মধুছন্দার আবেদন মঞ্জুর করলেও ইন্দ্রনীলের আবেদন খারিজ করে দেয়। ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী। কিন্তু গ্রেফতারির পর তিনি সেই আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। শীর্ষ আদালত তাঁকে তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ‘ভুয়ো’ পাস বিক্রি করে দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ এবং ‘প্রিভিলেজ্ড পুজো এন্ট্রি’-র নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলা হত। এই টিকিট বিক্রির প্রচারে ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ। মামলার তদন্তে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও উঠে এসেছে।
‘মাস আর্ট’ সংক্রান্ত তদন্তে ইডি-র তরফে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছিল, ইন্দ্রনীলের সংস্থা থেকে মমতাকে ৩০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল। ইডি-র দাবি, ইন্দ্রনীল মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট এবং তাঁর মালিকানাধীন সংস্থা ‘অক্টেভ রেকর্ডস’-এর অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে মোট ৩.৮ কোটি টাকা জমা পড়েছিল। পরে ওই সংস্থার অ্যাকাউন্ট থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরিত হয়। যদিও ইন্দ্রনীলের দাবি, ওই অর্থ ‘রয়্যালটি’ বাবদ দেওয়া হয়েছিল। এই আর্থিক লেনদেন এবং পুজোর পাস বিক্রির অভিযোগের সূত্র ধরেই এ বার মধুছন্দাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছেন তদন্তকারীরা।

