শৈশবে দুর্গাপুজো মানেই ছিল নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ, ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত সাজপোশাকের পরিকল্পনা আর বাবা-মায়ের হাত ধরে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখা। কিন্তু মাত্র ১৩ বছর বয়সে দুর্গাপুজোর আগেই মাকে হারিয়ে সেই আনন্দের ছবিতে চিরকালের জন্য ছেদ পড়ে। আজও পুজোর স্মৃতি হাতড়ালে আনন্দের পাশাপাশি ফিরে আসে সেই গভীর শোক। মাকে হারানোর সেই বেদনাকে সঙ্গী করেই গত ২৪ বছর ধরে মুম্বইয়ে দুর্গাপুজোর আয়োজন করে আসছেন বিশ্বজিৎ। স্ত্রী ইরা চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে শুরু করা সেই পুজো আজ পরিচিতি পেয়েছে ‘বিশ্বজিতের পুজো’ নামে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে শৈশবের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে বিশ্বজিৎ জানান, দশ-বারো বছর বয়স পর্যন্ত পুজো ছিল তাঁর কাছে নিখাদ আনন্দের উৎসব। পছন্দের জামাকাপড় কেনা হত। ষষ্ঠী, সপ্তমী কিংবা অষ্টমীতে কোন পোশাক পরবেন, তা আগে থেকেই ঠিক করে গুছিয়ে রাখা থাকত। নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ আজও তাঁর স্মৃতিতে অমলিন।
বিশ্বজিতের কথায়, নতুন পোশাকের প্রতি এতটাই টান ছিল যে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময়েও সেগুলি মাথার কাছে নিয়ে শুতেন। বাবা-মায়ের হাত ধরে নতুন জামাকাপড় পরে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার আনন্দ ছিল একেবারেই অন্য রকম।
কিন্তু সেই আনন্দের দিনগুলিই একসময় হয়ে ওঠে গভীর বেদনার স্মৃতি।
দুর্গাপুজোর আগেই মাকে হারানো
মাত্র ১৩ বছর বয়সে দুর্গাপুজোর ঠিক আগে মাকে হারান বিশ্বজিৎ। তাঁর কথায়, মায়ের চলে যাওয়া ছিল জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি। মায়ের মৃত্যুর পর পারলৌকিক ক্রিয়ার দায়িত্বও তাঁকে সামলাতে হয়েছিল। বাবা তাঁকে দিয়ে সেই সমস্ত কাজ করিয়েছিলেন। সেই কঠিন সময়ে মাসিমা তাঁকে বুকে টেনে নিয়ে আগলে রেখেছিলেন।
বিশ্বজিৎ জানান, দুর্গাপুজোর মধ্যেই মায়ের শ্রাদ্ধশান্তির সমস্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। উৎসবের আনন্দের মাঝেই তাঁকে মেনে নিতে হয়েছিল জীবনের সবচেয়ে বড় শোকগুলির একটি। সেই স্মৃতি আজও তাঁর মনে গভীরভাবে রয়ে গিয়েছে।
মায়ের প্রতি পরিবারের অন্য সদস্যদের ভালোবাসার কথাও স্মরণ করেন তিনি। বিশ্বজিতের বড়মামা তাঁর মাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। মায়ের মৃত্যুর পর বিশ্বজিৎ যাতে নতুন জামাকাপড় না পেয়ে আরও কষ্ট না পান, সেই কথা ভেবে বড়মামা নিজের ছেলেমেয়েদেরও সে বছর পুজোয় নতুন জামাকাপড় কিনে দেননি।
বিশ্বজিতের কথায়, দুর্গাপুজোর স্মৃতি মনে পড়লেই মায়ের কথা বার বার ফিরে আসে। গত ২৪ বছর ধরে মুম্বইয়ে দুর্গাপুজোর আয়োজন করলেও নিজের মাকে কাছে না পাওয়ার শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি।
মুম্বইয়ে বাঙালিয়ানার আবহে পুজোর সূচনা
মায়ের স্মৃতিকে হৃদয়ে রেখেই স্ত্রী ইরা চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে মুম্বইয়ের জুহু স্কিম সর্বজনীনে দুর্গাপুজো শুরু করেন বিশ্বজিৎ। শুরুটা হয়েছিল একেবারেই সাধারণভাবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আরও অনেকে। ধীরে ধীরে সেই পুজোই পরিচিতি পেয়েছে ‘বিশ্বজিতের পুজো’ নামে।
এখন কলকাতা থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এই পুজো দেখতে আসেন। ঠাণে, নাসিক-সহ নানা জায়গা থেকে দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। অনেকেই বিশ্বজিতের সঙ্গে দেখা করতে আসেন, কেউ আবার তাঁর পুজোর সুনাম শুনে হাজির হন।
দর্শনার্থীদের এই ভালোবাসা তাঁকে আনন্দ দেয়। পুজোর পরিসর বড় হলেও উৎসবের মূল আবেগ ও বাঙালিয়ানাকে ধরে রাখাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একচালার প্রতিমা, সাবেকি পুজোতেই আস্থা
বিশ্বজিতের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য সাবেকি আয়োজন। এখনও একচালার প্রতিমাতেই তাঁর আস্থা। আগে প্রতিমা তৈরি করতেন শিল্পী নিমাই পাল। তাঁর মৃত্যুর পর সেই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তাঁর ছেলে অমিত পাল। মুম্বই ও পুণের বেশির ভাগ প্রতিমাই অমিতের হাতে তৈরি হয়।
পুজোর অন্যান্য আয়োজনেও কলকাতার সঙ্গে যোগ বজায় রাখেন বিশ্বজিৎ। ঢাকি আসেন কলকাতা থেকে। ভোগ রান্নার দায়িত্বেও রয়েছেন কলকাতার একজন রাঁধুনি।
বিশ্বজিতের কাছে দুর্গাপুজো শুধুই উৎসব নয়, ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সমন্বয়। তাঁর পুজোয় আড়ম্বরের চেয়ে প্রাধান্য পায় সাবেকি রীতি ও আন্তরিকতা। দর্শনার্থীরা যাতে ভালোভাবে ভোগ খেতে পারেন, সে দিকেও বিশেষ নজর রাখেন তিনি।
পুজোমণ্ডপে সারাক্ষণ শোনা যায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ। পাশাপাশি বাজে সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শচীন দেববর্মন ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মননকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করেন বিশ্বজিৎ। দর্শনার্থীদের জন্য থাকে ঝালমুড়ি ও ফুচকার স্টলও, যা বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
এ বার সোনারঙের প্রতিমা, নেপথ্যে রুপোর সাজ
পুজোর প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। এ বছর স্ত্রী ইরা ও মেয়ে সম্ভবীর ইচ্ছায় সোনারঙের প্রতিমা আনার পরিকল্পনা করেছেন বিশ্বজিৎ। প্রতিমার সাজে থাকবে রুপোর ছোঁয়া। অর্থাৎ, এ বার ‘সোনা-রুপো’য় সেজে আসবেন দেবী দুর্গা। পুজোকে কেন্দ্র করে নানা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হবে।
আগামী বছর এই পুজোর রজতজয়ন্তী। সেই বিশেষ উপলক্ষেও পুজোকে আরও সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার ইচ্ছা রয়েছে বিশ্বজিতের। তাঁর আশা, মায়ের আশীর্বাদ থাকলে আগামী বছর আরও ভালোভাবে দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে পারবেন তাঁরা।
শৈশবের আনন্দ আর মাকে হারানোর বেদনা— দুই বিপরীত অনুভূতিকেই বুকে নিয়ে বিশ্বজিতের এই পুজো আজও এগিয়ে চলেছে। তাঁর কাছে দুর্গাপুজো তাই শুধু দেবী আরাধনা নয়, মায়ের স্মৃতিকে আগলে রাখা এবং প্রবাসে বাঙালিয়ানার বন্ধন অটুট রাখারও এক আন্তরিক প্রয়াস।

