এশিয়ার দুই শক্তিধর দেশ— চিন ও ভারত একসঙ্গে মিলে কাজ করুক এবং পরস্পরের ক্ষমতাকে কাজে লাগাক। শনিবার নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই বার্তা দিলেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গলওয়ান সংঘাতের পর এই প্রথম বার ভারতের মাটিতে মুখোমুখি বসলেন দুই দেশের রাষ্ট্রনেতা। এ দিনের বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনাময় দিকগুলি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজ়ানে মুখোমুখি বসেছিলেন মোদী এবং জিনপিং। সেই বৈঠকের পর থেকেই ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ধীরে ধীরে বরফ গলতে শুরু করে। যদিও দু’দেশের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে মতপার্থক্য ও সমস্যা এখনও রয়ে গিয়েছে, তবে সম্পর্ক মসৃণ করতে উভয় পক্ষই সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এ দিনের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী জানান, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, “দু’দেশকেই পারস্পরিক স্বার্থ, শ্রদ্ধা এবং সংবেদনশীলতা— এই তিনটি বিষয়ের উপরে জোর দিতে হবে।” ভারত এবং চিনের মতপার্থক্য যেন কখনওই দু’দেশের বিবাদে পরিণত না হয়, তার উপরেও যৌথভাবে জোর দেন মোদী এবং জিনপিং।
দিল্লির এই বৈঠকে চিনা প্রেসিডেন্ট বলেন, “একে অপরের ক্ষমতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যৌথ উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে পারে ভারত এবং চিন।” এর মাধ্যমে বেজিং যে দিল্লির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এবং কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, তা পরিষ্কার করে দিয়েছেন জিনপিং। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী মোদীও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সীমান্ত পরিস্থিতি শান্ত ও স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, গলওয়ান সংঘাতের পর থেকেই ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন সময়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চিন। দু’দেশের পারস্পরিক শক্তির প্রতীক হিসেবে অতীতে তারা ‘হাতি’ (ভারত) এবং ‘ড্রাগন’ (চিন)-এর উপমাও ব্যবহার করেছে। আমেরিকা-চিন শুল্কযুদ্ধের আবহেও বেজিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ড্রাগন এবং হাতিকে একসঙ্গে মিলে কাজ করতে হবে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে না গিয়ে পরস্পরকে সাহায্য করা উচিত। এশিয়ার এই দুই বৃহত্তম অর্থনীতি একজোট হলে তা সমগ্র বিশ্বের পক্ষেই লাভজনক হবে বলে দাবি করেছে বেজিং।
এ দিনের বৈঠকের আগে দিল্লির চিনা রাষ্ট্রদূত শু ফেইহং-ও বন্ধুত্বের বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘জিনপিং ও মোদীর কৌশলগত নির্দেশনায় চিন ও ভারত মিলেমিশে কাজ করবে। দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাব আমরা। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ এবং সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে।’’ পাশাপাশি, মতপার্থক্য দেখা দিলে তা কূটনৈতিকভাবে সামাল দেওয়ার বার্তাও দেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে শেষ বার ভারত সফরে এসেছিলেন জিনপিং। এরপরে ২০২০ সালের গলওয়ান সংঘাতের জেরে দু’দেশের সম্পর্কে গভীর শৈত্য তৈরি হয় এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজ়ানে ঐতিহাসিক বৈঠকে বসেন দুই রাষ্ট্রনেতা। সেখান থেকেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ফের স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত বছরে চিনের তিয়ানজিনেও তাঁরা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় মিলিত হয়েছিলেন। আর এ বার নয়াদিল্লিতে বৈঠকের মাধ্যমে এশিয়ার দুই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরাশক্তির সম্পর্ক এক নতুন মোড় নিল।

