দুর্গাপূজার আগে বকেয়া বেতন প্রদান এবং চাকরি হারিয়ে মৃত ১১ জনজাতি সম্প্রদায়ের ‘যোগ্য’ শিক্ষকের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও চাকরির দাবিতে সরব হয়েছেন ২০১৬ সালের বাতিল প্যানেলের চাকরিহারা শিক্ষকেরা। ‘চাকরিহারা অনশনকারী মঞ্চ’-এর পক্ষ থেকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে তারা বৃহত্তর আন্দোলনে নামবেন।
পটভূমি ও আইনি জট প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ২০১৬ সালের সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল হয়ে যাওয়ায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী চাকরি হারান। শিক্ষকদের প্রধান প্রশ্ন, ওএমআর শিট এবং অযোগ্যদের তালিকা প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও কেন যোগ্যদের চাকরি বাতিল করা হবে?
গত বছর যোগ্য শিক্ষকদের পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হলেও অনেকে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী প্রথম দফা নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার কথা ছিল ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। রাজ্য সরকার সেই সময়সীমা মানতে না পেরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে ৮ মাস সময় বৃদ্ধি করায় তা ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এর মাঝে রাজ্যে পালাবদল ঘটে এবং ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার ফের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলে শীর্ষ আদালত শেষবারের মতো সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত নির্ধারণ করে। ফলে দুর্নীতির প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের ভবিষ্যৎ দীর্ঘ সময় ধরে চরম অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে।
বিকাশ ভবন অভিযান ও মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক সোমবার দুপুর ১টায় করুণাময়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি সুসংহত মিছিল বের করেন যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা। বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যদের উপস্থিতিতে সেই বিক্ষোভ গড়ায় বিকাশ ভবনের সামনে, যেখানে তারা রাতভর অবস্থান করেন। তাঁদের মুখ্য দাবি ছিল, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সরাসরি দেখা করে যোগ্যদের চাকরিতে ফেরানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
এর জেরে মঙ্গলবার সকালে ফের বিকাশ ভবনে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। মঞ্চের আহ্বায়ক সুমন বিশ্বাস জানান, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। বৈঠকে মন্ত্রীকে জানানো হয় যে, যোগ্য শিক্ষকদের সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে এবং যোগ্যদের তালিকা নিয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করতে হবে। বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন শুভেন্দু অধিকারী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা যাতে বর্তমান সরকার রক্ষা করে, সে বিষয়েও স্মারক লিপি দেওয়া হয়।
মুখ্য দাবিগুলি
- বেতন চালুকরণ: ৩,৩৯৪ জন শিক্ষাকর্মীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও গত ১৮ মাস ধরে তাঁরা বেতনহীন। দুর্গাপূজার আগেই তাঁদের বকেয়া বেতন চালু করে কাজে ফিরিয়ে নিতে হবে।
- ক্ষতিপূরণ ও চাকরি: যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চাকরি হারিয়ে মানসিক ও শারীরিক কষ্টে মারা যাওয়া জনজাতি সম্প্রদায়ের ১১ জন শিক্ষকের পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের একজনের জন্য সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে।
- অনশনকারীদের হুঁশিয়ারি: সুমন বিশ্বাস জানান, স্কুলশিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তাঁদের দাবি শুনেছেন এবং আজই তা মুখ্যমন্ত্রীকে জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁরা সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা না বাঁধলেও সাত দিনের বেশি অপেক্ষা করতে নারাজ। দুর্গাপূজার মধ্যে বকেয়া বেতন ও ক্ষতিপূরণ না মিললে বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
‘যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ’-এর মেহবুব মণ্ডল জানান, সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে তারা যেন দ্রুত সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে আইনানুগ পদক্ষেপ করে। এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন পূর্বের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, তেমনই চাকরিহারাদের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার ঘটাবে।

