রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বীরভূমের রামপুরহাটে। রবিবার সকালে তাঁর নিজের বাড়ির নীচতলায় অবস্থিত পার্টি অফিস থেকে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক ও প্রাক্তন অধ্যাপকের দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২৩৩ শব্দের একটি চিঠি, যা প্রাথমিক তদন্তে ‘সুইসাইড নোট’ বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পুজো দেওয়ার পুরনো অভ্যাস ছিল আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের। রবিবার সকালে দীর্ঘক্ষণ তিনি নীচতলার পার্টি অফিসে থাকা দেব-দেবীর ছবির সামনে থেকে না ফেরায় সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ তাঁর পরিবারের সন্দেহ হয়। তাঁর ভাইপো তথা আইনজীবী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিচে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দেন এবং সাড়া না পেয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে কাকার ঝুলন্ত দেহ দেখতে পান। খবর দেওয়া হয় রামপুরহাট থানায়।
সকাল প্রায় ৭টা নাগাদ পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পুলিশের উপস্থিতিতে ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে দেখা যায়, সবুজ নাইলনের দড়িতে ঝুলে রয়েছে তাঁর দেহ। পাশের টেবিলে একটি লেটারহেড প্যাডে সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা একটি চিঠি উদ্ধার হয়। চিঠির শুরুতে লেখা রয়েছে, ‘‘ছাত্রাবস্থা থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কোনোদিনই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হইনি…।’’ চিঠির মাঝামাঝি অংশে উল্লেখ রয়েছে, ‘‘আমাকে ম্যালাইন (কালিমালিপ্ত) করার জন্য যা সব করা হল…’’ এবং শেষে লেখা, ‘‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।’’
মৃত্যুর এই ঘটনায় রাজনৈতিক ও পারিবারিক স্তরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে:
- স্বাভাবিক আচরণ ও ঘটনার আকস্মিকতা: আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, শনিবার রাত পর্যন্তও তাঁদের মধ্যে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান নিয়ে কথাবার্তা হয়েছিল। রাতের খাবার খেয়ে তিনি নিজের ঘরে ঘুমোতে যান। হঠাৎ রাতের কয়েকটি ঘণ্টার মধ্যে এমন কী ঘটল, যা তাঁকে এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল, তা নিয়ে পরিবার ও প্রতিবেশীরাও বিস্মিত।
- চিঠির গঠন ও বিষয়বস্তু: উদ্ধার হওয়া চিঠিটি সাধারণ সুইসাইড নোটের চেয়ে অনেকটাই দীর্ঘ। এতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি পরিবারকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণায় হস্তাক্ষর আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের হলেও, তা নিশ্চিত করতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে।
- ময়নাতদন্তের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ: প্রাথমিক রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘অ্যান অ্যান্টেমর্টেম নন-কন্টিনিউয়াস হ্যাঙ্গিং’ বা জীবিত অবস্থায় ফাঁস দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে, যা আত্মহত্যার তত্ত্বকে জোরালো করে। তবে কোনো প্ররোচনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণে দল-মত-শিবির নির্বিশেষে রাজনৈতিক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও সজ্জন ব্যক্তিত্বের কথা স্বীকার করেছেন সমস্ত শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্ব।
- শুভেন্দু অধিকারী: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মন্তব্য করেন, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে একজন সজ্জন, শিক্ষিত ও ভদ্র মানুষ ছিলেন। তাঁর মতে, কেউ তাঁকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে থাকতে পারে বা ‘ব্ল্যাকমেল’ করে থাকতে পারে। মৃত্যুর সঠিক কারণ ও প্ররোচনা অনুসন্ধানে প্রয়াত নেতার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন দুটি পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
- অগ্নিমিত্রা পাল: রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ঘটনাটি নিছক আত্মহত্যা নাকি অন্য কিছু, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, চিঠি উদ্ধার হওয়া মানেই তা আত্মহত্যা কি না, তদন্তের পরেই তা স্পষ্ট হওয়া উচিত।
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যান্য নেতৃত্ব: প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে শোকপ্রকাশ করে জানান যে, ‘রাজনৈতিক বৈরিতা’ এবং ক্রমাগত কুৎসা ও অপমানের মানসিক যন্ত্রণা থেকেই এই পরিণতি ঘটেছে। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে এক যুবকের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। অন্যদিকে, বীরভূম জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল (কেষ্ট) সামাজিক মাধ্যমে নোংরা কাদা ছোড়াছুড়িকে দায়ী করার পাশাপাশি পূর্বে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার প্রেক্ষিতে আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সমগ্র বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এবং সুইসাইড নোটের সত্যতা ও মানসিক চাপের উৎস খুঁজে বের করতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

