শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক হত্যা মামলা: সিবিআইয়ের জালে আরও ২, অন্তর্ঘাতের আশঙ্কায় ঘনীভূত রহস্য

শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক হত্যা মামলা: সিবিআইয়ের জালে আরও ২, অন্তর্ঘাতের আশঙ্কায় ঘনীভূত রহস্য

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপির শীর্ষ নেতা শুভেন্দু অধিকারীর তৎকালীন আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড়। মূল চক্রী সন্দেহে আরও দু’জনকে গ্রেফতার করল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (সিবিআই)। ধৃতেরা সম্পর্কে দুই ভাই—সাগর সোনকর এবং সাহেব সোনকর। সিবিআই সূত্রের খবর, শুক্রবার তাঁদের টানা জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেফতার করা হয়।

তদন্তকারীদের দাবি, ইতিপূর্বে এই মামলায় গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তেরা কেবল ভাড়াটে শুটার বা মাধ্যম (মিডলম্যান) হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু সদ্য ধৃত সোনকর ভ্রাতৃদ্বয় ছিলেন এই সম্পূর্ণ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের মূল রূপকার বা ‘মাস্টারমাইন্ড’।

বিজেপির সঙ্গে যোগ ও রাজনীতির সমীকরণ

সিবিআই সূত্রের খবর, ধৃত সাগর ও সাহেব দু’জনেই বিজেপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নিহত চন্দ্রনাথ রথের পূর্বপরিচিত। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ২০২০ সালে তাঁরা বিজেপিতে যোগ দেন। তার পূর্বে তাঁরা অন্য একটি রাজনৈতিক দলের এক বিধায়কের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

সিবিআইয়ের এক আধ্যাত্মিক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুটার জোগাড় করা, অর্থ ও ‘রসদ’ সরবরাহ, চন্দ্রনাথের গতিবিধির ওপর নজরদারি (রেকি করা) সহ খুনের যাবতীয় নকশা তৈরি করেছিলেন এই দুই ভাই। সিবিআইয়ের দাবি, অন্তত ২০২৫ সাল থেকেই অর্থাৎ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের বহু আগে থেকেই চন্দ্রনাথকে সরিয়ে দেওয়ার এই ষড়যন্ত্র চলছিল।

আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগের ইঙ্গিত

তদন্তে আরও প্রকাশ পেয়েছে, সাগর নিয়মিত ল্যান্ডলাইন ফোনের মাধ্যমে কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। সিবিআইয়ের ইঙ্গিত, প্রতিপক্ষ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গেই তাঁর এই লেনদেন ও কথোপকথন চলছিল। সম্পূর্ণ ‘অপারেশন’-এর টাকা লেনদেন থেকে শুরু করে পেশাদার খুনিদের বায়না দেওয়া—সবটাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন সাগর ও তাঁর ভাই। তবে ঠিক কোন বিরোধী রাজনৈতিক দল বা নেতার নির্দেশে তাঁরা এই কাজ করেছিলেন, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। একই সঙ্গে, ব্যক্তিগত শত্রুতা নাকি গভীর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে এই হত্যা, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

যেভাবে ঘটেছিল হত্যাকাণ্ড

উল্লেখ্য, গত বছর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের অব্যবহিত পরেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। ৪ মে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর যখন শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা চলছিল, ঠিক তার দু’দিন পর ৬ মে রাতে মধ্যমগ্রামে নিজ বাসস্থানে ফেরার পথে আক্রান্ত হন চন্দ্রনাথ রথ।

গাড়ির চালকের পাশের আসনে বসা চন্দ্রনাথকে লক্ষ্য করে বাইকে আসা দুষ্কৃতীরা পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি চালিয়ে চম্পট দেয়।

ঘটনার তদন্তে নেমে সিবিআই এ পর্যন্ত শার্প শুটার মনু সিংহ, রাজ সিংহ, গোলু সিংহ, ময়াঙ্করাজ মিশ্র, ভিকি মৌর্য ও নবীনকুমার সিংহ সহ সাহায্যকারী বিনয় রায়, সঞ্জয় রায় এবং বিকাশ মিশ্রকে গ্রেফতার করেছে। আগামী আগস্ট মাসেই এই হত্যা মামলায় আদালতে প্রথম চার্জশিট পেশ করতে পারে সিবিআই।

দলের প্রতিক্রিয়া ও অন্তর্ঘাত তত্ত্ব

বিজেপির শীর্ষনেতার আপ্তসহায়ক খুনে দলীয় যোগসূত্রে দু’জনের গ্রেফতারির পর অন্তর্ঘাত (ইনসাইড জব)-এর জল্পনা নতুন করে উসকে উঠেছে। এ বিষয়ে রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “এদের আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি না। তবে চন্দ্রনাথ আমার অত্যন্ত কাছের ছিলেন, আমি একজন ভাইকে হারিয়েছি। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। অপরাধী যেই হোক না কেন, দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো ‘পলিটিক্যাল ইমিউনিটি’ বা রাজনৈতিক সুরক্ষা কেউ পাবে না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.