আর্থিক আত্মনির্ভরতা অর্জনের অদম্য জেদই একসময় ডেকে এনেছিল চরম বিপর্যয়। সরকারি হাসপাতালে নার্সের চাকরি পেয়ে স্বাবলম্বী হতে চাওয়ার অপরাধে ঘুমের ঘোরেই স্বামী ও তাঁর সহযোগীরা কেটে নিয়েছিলেন ডান হাতের কব্জি। তবে সেই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এক অনন্য নজির গড়লেন পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের মেয়ে রেণু খাতুন। কৃত্রিম ডান হাত আর অনুশীলনে আয়ত্ত করা বাঁ হাতকে সম্বল করে নিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেন তিনি।
রোববার বর্ধমান জেলা গ্রন্থাগারে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে রেণুর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নিসর্গে মিশে যাই’-এর আনুষ্ঠানিক উন্মোচন হয়। আবেগঘন সেই মুহূর্তে বইটির প্রথম কপি নিজেরস্বাবলম্বী হওয়ার মাশুল কাড়তে চেয়েছিল ডান হাত, বাঁ হাতে কাব্যগ্রন্থ লিখে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত কেতুগ্রামের রেণুর
বিশেষ সংবাদদাতা, পূর্ব বর্ধমান: আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার অপরাধে এক সময় স্বামীর নৃশংসতার শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। ঘুমন্ত অবস্থায় মুখে বালিশ চাপা দিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছিল ডান হাতের কব্জি। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরে সরকারি নার্সের চাকরি পাওয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবে নেমে এসেছিল এই চরম নির্যাতন। কিন্তু সেই ভয়াল আঘাতও দমিয়ে রাখতে পারেনি পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের চিনিসপুরের মেয়ে রেণু খাতুনকে। কৃত্রিম হাত নিয়ে জীবনসংগ্রামে জয়ী হওয়ার পর এবার বাঁ হাতে আস্ত একটি কাব্যগ্রন্থ লিখে নতুন এক নজির গড়লেন তিনি।
রবিবার বর্ধমান জেলা গ্রন্থাগারে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রকাশিত হয় রেণুর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নিসর্গে মিশে যাই’। নিজের এই সাহিত্যযাত্রার প্রথম মাইলফলকটি তিনি উৎসর্গ করেছেন নিজের বাবাকে। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সজল চোখে কাব্যগ্রন্থের প্রথম কপিটি বাবা আজিজ়ুল শেখের হাতে তুলে দেন রেণু। এরপর কৃত্রিম ডান হাতে বাবাকে প্রণাম করার পর এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রেণু বলেন, “অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল নিজের ভাবনা ও অনুভূতিগুলোকে শব্দ দিয়ে সাজিয়ে দুই মলাটের মধ্যে বন্দি করব। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হলো, আমি অত্যন্ত আনন্দিত। ছোটবেলা থেকেই মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখেছি। জীবনের কঠিন সময় আমায় থামাতে পারেনি; বরং নতুন করে বাঁচতে, লিখতে এবং অন্যদের অনুপ্রেরণা জোগাতে শিখিয়েছে।”
ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালের ৪ জুন। আরজি কর হাসপাতাল থেকে নার্সিং প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন রেণু। পরবর্তীতে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরে সরকারি নার্সের পদে তিনি উত্তীর্ণ হন। তবে স্বামী শের মহম্মদ চাননি রেণু চাকরি করুন। স্ত্রীর স্বাবলম্বিতা এবং সরকারি চাকরি পেলে তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়ার অযৌক্তিক ভীতি থেকে সৃষ্টি হয় তীব্র পারিবারিক কলহ। নিজের সিদ্ধান্তের অনড় রেণু চাকরি করবেনই— এই জেদের পরই ঘটে সেই মর্মান্তিক ঘটনা। ৪ জুন রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় শের মহম্মদ ও তার সহযোগীরা রেণুর ডান হাতের কব্জি কেটে নেয়।
পুরো রাজ্যকে নাড়িয়ে দেওয়া এই ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেফতার করলেও বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত এবং মামলাটি বিচারাধীন।
হাত হারানোর পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ উদ্যোগে রেণুর চিকিৎসার পাশাপাশি কৃত্রিম হাতের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে তিনি বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের নার্সিং ট্রেনিং স্কুলে সেবিকা হিসেবে যোগ দেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কৃত্রিম হাত ব্যবহারের পাশাপাশি বাঁ হাতে লেখার কঠোর অনুশীলন শুরু করেন রেণু। সেই চর্চ থেকেই একের পর এক কবিতার জন্ম, যা রূপ নিল প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থে।
সবচেয়ে প্রিয়জনের থেকে পাওয়া গভীর আঘাতের অভিঘাত বুকে নিয়েই কলমের আঁচড়ে জীবন, প্রকৃতি ও অদম্য লড়াইয়ের গল্প বুনেছেন রেণু খাতুন। কাব্যগ্রন্থের সাহিত্যিক মূল্য মূল্যায়িত হবে পাঠকমহলে, তবে প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে বর্ধমানের এই কন্যার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস সমাজকে এক অনন্য বার্তা পৌঁছে দিল।

