মমতা শিবির ত্যাগ করেই মদন মিত্রের নিশানায় অভিষেক, দলের ভাঙন ঘিরে চড়ছে রাজনৈতিক পারদ

মমতা শিবির ত্যাগ করেই মদন মিত্রের নিশানায় অভিষেক, দলের ভাঙন ঘিরে চড়ছে রাজনৈতিক পারদ

তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন ও অন্তর্দ্বন্দ্বের আবহ এবার এক নতুন মাত্রা নিল। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েই সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন মদন মিত্র। আনন্দবাজার ডট কম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মদন মিত্র ‘তৃণমূল কংগ্রেস মাইনাস অভিষেক’ সূত্র সামনে এনেছেন। দলনেত্রীর উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলব, যত লোকজন সবই আপনারই। আপনি বলুন, অভিষেককে আমি সরিয়ে দিচ্ছি। আপনার সমস্ত তৃণমূল এক হয়ে গিয়ে লড়াই করবে। দেখুন, আবার পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল তার জায়গা ফিরে পাবে।”

আদিগঙ্গার পাড়ে ভাঙনের কেন্দ্রে ‘অভিষেক-আইপ্যাক’ বিতর্ক

কালীঘাটে দলের অন্দরে ভাঙনপর্ব শুরু হওয়ার পর থেকেই বিক্ষুব্ধ ও দলত্যাগী নেতাদের মূল নিশানায় রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক মহলের মতে, এর সূত্রপাত নির্বাচনের ভরাডুবির পর ৩০ বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে আয়োজিত দলের প্রথম বৈঠক থেকেই। সেই বৈঠকে জয়ী বিধায়কদের অভিষেকের লড়াইকে সম্মান জানিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু দলনেত্রীর সেই নির্দেশ অমান্য করেন বাগনানের বিধায়ক অরুণাভ সেন, যিনি বর্তমানে বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম প্রধান মুখ।

পরবর্তীকালে, যাঁরা দল ছেড়েছেন তাঁরা প্রত্যেকেই বিপর্যয়ের জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভোটকুশলী সংস্থা ‘আইপ্যাক’-কে দায়ী করেছেন। এমনকি দলের অভ্যন্তরে থেকেও আইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রবীণ নেতা। অভিষেকের সাথে মতপার্থক্যের কারণে একসময় হাইকোর্টে তাঁর মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণাও করেছিলেন কল্যাণ। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও অভিষেককে নিয়ে তাঁর ক্ষোভ একাধিকবার প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি মমতা শিবিরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষও জড়িয়ে পড়েছেন অভিষেকের সঙ্গে বিতণ্ডায়।

দুর্নীতির তীরে বিদ্ধ ডায়মন্ড হারবার ফুটবল ক্লাব ও দলীয় তহবিল

বুধবার ঋতব্রতের শিবিরে যোগ দেওয়ার পরেই অভিষেককে লক্ষ্য করে সুর আরও চড়িয়েছেন মদন মিত্র। কখনও তাঁকে ‘হিটলারের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন, তো কখনও সরাসরি এনেছেন দুর্নীতির অভিযোগ। একই সুর শোনা গিয়েছে বীরভূমের দাপুটে নেতা অনুব্রত মণ্ডলের গলাতেও।

অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও অভিষেকের চার্টার বিমান চড়া থেকে শুরু করে তাঁর ডায়মন্ড হারবার ফুটবল ক্লাব নিয়ে বিস্ফোরক দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। এই ক্লাবকে ‘চাটার্ড মাফিয়া’ বলে কটাক্ষ করার পাশাপাশি ঋতব্রতের প্রশ্ন:

“দলের এই বিপুল পরিমাণ টাকা কোথায় গেল? জানতে চাই, ডায়মন্ড হারবার ক্লাবের মাধ্যমে দলের টাকা কি কেরল হয়ে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে গিয়েছে?”

উল্লেখ্য, ঋতব্রত শিবিরের বিধায়কদের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই তদন্তে নেমেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। ইডি-র প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃণমূলের দলীয় তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিমান সংস্থার মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে। এই আর্থিক তছরুপের অভিযোগকেই এখন হাতিয়ার করছেন ঋতব্রত ও তাঁর সহযোগীরা।

পাশে দাঁড়িয়ে ‘বাঘের মতো লড়ছে’ সার্টিফিকেট মমতার, কটাক্ষ কুণালের

অভিষেককে ঘিরে দলের ভেতরে ও বাইরে এত ঝড়ের মধ্যেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু প্রথম থেকেই ভাইপোর পাশেই দাঁড়িয়েছেন। মদন মিত্রের দলত্যাগ বা অনুব্রত মণ্ডলের আক্রমণকে গুরুত্ব দিতে নারাজ দলনেত্রী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, “এগুলো সবই দল ছাড়ার বাহানা।” অভিষেককে দরাজ শংসাপত্র দিয়ে তিনি বলেন, “বাঘের মতো লড়ছে অভিষেক।” সেই সঙ্গে বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা:

“যদি আপনাদের চোখে অভিষেক কোনও অপরাধ করেও থাকে, তা আমি ক্ষমা করে দিয়েছি, কারণ ও লড়ছে।”

এদিকে মদন মিত্রের এই আচমকা সুরবদলকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, “ওঁর কিছু মনে হতেই পারে। সেটা দিদিকে বলার সুযোগ আগেও পেতেন, ভবিষ্যতেও পাবেন। ইডি মদনদাকে পারিবারিক নিমন্ত্রণটা (তদন্তের নোটিশ) দেওয়ার আগে তিনি যদি এই কথাগুলো বলতেন, তা হলে একটা অর্থ হত। কিন্তু ইডি-র কাছ থেকে পারিবারিক নিমন্ত্রণ পাওয়ার পরে তিনি এই কথাগুলো বলায় সকলেই বুঝতে পারছেন যে, এটা ওই পক্ষের কাছে ভাল সাজার চেষ্টা মাত্র।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মদন মিত্রের দলবদল এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৃণমূলের অন্দরের ফাটলকে আরও স্পষ্ট করে দিল। আগামী দিনে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.