রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলার রাশ শক্ত করতে পুলিশ প্রশাসনে বড়সড় রদবদল করল নবান্ন। একলপ্তে ৩৩ জন আইপিএস (IPS) এবং ডব্লিউবিপিএস (WBPS) অফিসারকে বদলি করা হয়েছে। এই রদবদলে যেমন বেশ কিছু আধিকারিককে অপেক্ষাকৃত ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ পদে পাঠানো হয়েছে, তেমনই দুর্নীতি দমনে কড়া ও দক্ষ অফিসার হিসেবে পরিচিতদের আনা হয়েছে প্রথম সারির গুরুদায়িত্বে।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আইপিএস নটরাজন রমেশ বাবুকে রাজ্য সিআইডি-র ডিরেক্টর জেনারেল (DG CID) পদে নিযুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বন্দিদের কাছ থেকে মোবাইল ও সিম কার্ড উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নতুন দায়িত্বের পাশাপাশি রমেশ বাবু অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কারা দফতরের ডিজির (DG Correctional Services) দায়িত্বও সামলাবেন।
সুপ্রতিম ও প্রবীণ ত্রিপাঠী গেলেন কম গুরুত্বপূর্ণ পদে, বিধাননগরের নতুন সিপি অমিত রাঠৌর
কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন কমিশনার (CP) সুপ্রতিম সরকারকে সিআইডি-র শীর্ষপদ (ADG CID) থেকে সরিয়ে টেলিকমিউনিকেশন দফতরের এডিজি (ADG) করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন তাঁকে কলকাতার সিপি পদ থেকে সরিয়ে এডিজি সিআইডি করেছিল। পরে তিনি তামিলনাড়ুতে পুলিশ পর্যবেক্ষকের দায়িত্বও সামলান। এবার তাঁকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পাঠানো হলো।
একইভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি হয়েছেন ২০০৪ ব্যাচের আইপিএস অফিসার প্রবীণ ত্রিপাঠী। বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাপ্রধান (Joint CP Traffic/Crime) থেকে শুরু করে হাওড়া ও ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এই অফিসার বর্তমানে রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্সে (STF) কর্মরত ছিলেন। তাঁকে এবার হোমগার্ডের আইজি (IG Home Guard) করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ত্রিপুরারি অথর্বকে বিধাননগরের পুলিশ কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে ট্রাফিক এবং সড়ক নিরাপত্তা দফতরের এডিজি করা হয়েছে। বিধাননগরের নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন অমিতকুমার রাঠৌর, যিনি এতদিন রায়গঞ্জ রেঞ্জের ডিআইজি (DIG) পদে কর্মরত ছিলেন।
অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখায় ‘কড়া অফিসার’ জয়রামন
পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই বিগত তৃণমূল আমলের ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’ নিয়ে সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আর্থিক দুর্নীতির তদন্তে কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিশনও গঠন করেছে রাজ্য সরকার। ১৯৯৭ ব্যাচের আইপিএস অফিসার কালিয়াপ্পন জয়রামনকে এই কমিশনের সদস্য সচিব করার পাশাপাশি এবার অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখার (Directorate of Economic Offences) প্রধান হিসেবে ‘বড় দায়িত্ব’ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ মহলে ‘অত্যন্ত কড়া’ অফিসার হিসেবে পরিচিত জয়রামন এর আগে উত্তরবঙ্গ অঞ্চলের এডিজি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৩ সালে শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার থাকাকালীন শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন পর্ষদের (SJDA) দুর্নীতিকাণ্ডের তদন্ত করে প্রাক্তন সিইও তথা আইএএস (IAS) অফিসার গোদালা কিরণ কুমারকে গ্রেফতার করে নজির গড়েছিলেন তিনি।
অপরাধের জেরে রদবদল বারুইপুর পুলিশ জেলাতেও
সাম্প্রতিক সময়ে বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুন, গণপিটুনিতে মৃত্যু এবং ফুটবল ম্যাচের জয়কে কেন্দ্র করে ১৭ বছরের এক নাবালকের গলা কেটে খুনের মতো একাধিক বড়সড় অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। এই আইন-শৃঙ্খলার অবনতির প্রেক্ষিতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর পুলিশ জেলাতেও রদবদল করা হয়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (Addl. SP) অতীশ বিশ্বাসকে বারুইপুর পুলিশ জেলার নতুন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার করা হয়েছে। অন্যদিকে, বারুইপুরের বর্তমান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পিনাকী দত্তকে সরিয়ে বারুইপুর পুলিশ জেলার অ্যাডিশনাল এসপি ডিআইবি (Addl. SP, DIB) পদে পাঠানো হয়েছে।
তালিকায় রয়েছেন আরও একাধিক উচ্চপদস্থ অফিসার
এদিনের বদলির তালিকায় এই প্রধান মুখগুলি ছাড়াও আরও একাধিক উচ্চপদস্থ আইপিএস আধিকারিক রয়েছেন। নবান্নের নির্দেশিকা অনুযায়ী বদলি হওয়া অন্যান্য অফিসারদের মধ্যে রয়েছেন— আনন্দ কুমার, বিশাল গর্গ, সুকেশকুমার জৈন, সুধীরকুমার নীলাকান্তম, ডেভিড ইভান লেপচা, দীনেশ কুমার, প্রদীপকুমার যাদব, বিশপ সরকার, ওয়াই এস জগন্নাথরাও, প্রতীক্ষা ঝাড়খরিয়া এবং যশপ্রীত সিংহ প্রমুখ। প্রশাসনের দাবি, রাজ্যের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মজবুত ও গতিশীল করতেই এই রুটিন রদবদল করা হয়েছে।

