বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের এমন এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব, যিনি কেবল ঔপন্যাসিক ছিলেন না, ছিলেন একাধারে সমাজ-সমন্বয়ক ও আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মতাত্ত্বিক। তৎকালীন সমাজে পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ ও খ্রিষ্টীয় মিশনারিদের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়ে হিন্দু ধর্ম যখন কুসংস্কার এবং আত্মবিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন বঙ্কিমচন্দ্র এগিয়ে আসেন। প্রাচীন ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যকাররা (যেমন আদি শংকরাচার্য বা রামানুজাচার্য) যেভাবে উপনিষদের আপাত-বিরোধী বাণীসমূহের ভেতর সমন্বয় সাধন করে হিন্দু ধর্মের বিভ্রান্তি দূর করেছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্রও ঠিক তেমনি আধুনিক যুক্তিবাদ, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে হিন্দু ধর্মের মূল সত্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এই অর্থে তাঁকে “আধুনিক যুগের আচার্য” বললে বিন্দুমাত্র অতিশয়োক্তি হয় না।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘ধর্মতত্ত্ব(অনুশীলন)’ (১৮৮৮) এবং ‘কৃষ্ণচরিত্র’ (১৮৮৬) গ্রন্থে হিন্দু ধর্মের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা কোনো আচার-সর্বস্ব বা পরলৌকিক ধর্ম নয়; তা সম্পূর্ণ ইহলৌকিক এবং মানবকল্যাণকামী। তিনি মনে করতেন, মানুষের অন্তর্নিহিত সমস্ত বৃত্তির সম্যক স্ফূর্তি ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশই হলো ধর্ম। একেই তিনি বলেছেন “অনুশীলন ধর্ম” ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ‘ধর্ম কি’ প্রবন্ধে আরব-ইউরোপের একেশ্বরবাদী ‘রিলিজিয়ন’ এর সঙ্গে ভারতের ধর্ম তথা হিন্দু ধর্মের পার্থক্য শুরুতেই তুলে ধরেছেন —-
“গুরু। ধর্ম্ম কথাটার অর্থ উল্টাইয়া দিয়া তুমি গোলযোগ উপস্থিত করিলে। ধর্ম্ম শব্দটা নানা প্রকার অর্থে ব্যবহৃত হয়। অন্যান্য অর্থে আমাদিগের প্রয়োজন নাই; তুমি যে অর্থে এমন ধর্ম্ম শব্দ ব্যবহার করিলে, উহা ইংরেজি Religion শব্দের আধুনিক তর্জমা মাত্র। দেশী জিনিস নহে।
শিষ্য। ভাল, Religion কি, তাহাই না হয় বুঝান।
গুরু। কি জন্য? Religion পাশ্চাত্ত্য শব্দ, পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিতেরা ইহা নানা প্রকারে বুঝাইয়াছেন; কাহারও সঙ্গে কাহারও মত মিলে না।#
শিষ্য। কিন্তু রিলিজনের ভিতর এমন কি নিত্য বস্তু কিছুই নাই, যাহা সকল রিলিজনে পাওয়া যায়?
গুরু। আছে। কিন্তু সেই নিত্য পদার্থকে রিলিজন বলিবার প্রয়োজন নাই; তাহাকে ধর্ম্ম বলিলে আর কোন গোলযোগ হইবে না।”
অর্থাৎ ‘ধর্ম কি’ বোঝানোর পরে এসেছে ধর্মের অনুশীলনের প্রসঙ্গ।
বঙ্কিমচন্দ্র মানুষের বৃত্তিসমূহকে চার ভাগে ভাগ করেছেন— শারীরিক, জ্ঞানার্জ্জনী, কার্যকারিণী এবং চিত্তরঞ্জিনী। এই সমস্ত বৃত্তির যখন ঈশ্বরের চরণে সমর্পণপূর্বক সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে, তখনই মানুষ প্রকৃত ‘মনুষ্যত্ব’ লাভ করে। বঙ্কিমচন্দ্র গুরুর মুখ দিয়ে বলিয়েছেন — “আমি ঠিক পাশ্চাত্ত্যদিগের অনুসরণ করিতেছি না। ভরসা করি, অনুসরণ করিতে বাধ্য নহি। সত্যের অনুসরণ করিলেই আমার উদ্দেশ্য সফল হইবে। এখন মনুষ্যের সমুদায় শক্তিগুলিকে চারি শ্রেণীতে বিভক্ত করা গেল। (১) শারীরিকী, (২) জ্ঞানার্জ্জনী, (৩) কার্য্যকারিণী, (৪) চিত্তরঞ্জিনী। এই চতুর্ব্বিধ বৃত্তিগুলির উপযুক্ত স্ফূর্ত্তি, পরিণতি ও সামঞ্জস্যই মনুষ্যত্ব”।
উপনিষদের গুরু-শিষ্য কথোপকথনের মতোই তিনি দুঃখ, সুখ , মনুষ্যত্ব , ভক্তি, প্রীতি ও বিভিন্ন কার্যকারিণী বৃত্তির সামঞ্জস্যপূর্ণ অনুশীলন সম্পর্কে যুগপোযোগী ধারণা দিয়েছেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, এই ধর্মের অনুশীলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ‘ভক্তি’। আর এই ভক্তির প্রকাশ ঘটে ‘প্রীতি’ বা ভালোবাসার মাধ্যমে। প্রীতির ক্রমবিস্তার নিজের থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, স্বদেশ এবং পরিশেষে সমগ্র জগতের প্রতি প্রসারিত হয়। এই স্বদেশপ্রীতিই বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মতত্ত্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এই স্বদেশপ্রীতি আর স্বধর্মপ্রীতির মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র কোনো পার্থক্য করেন নি। হিন্দু ধর্মের সঠিক অনুশীলন বোঝানোর জন্যই তাঁর ‘ধর্মতত্ত্ব’। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন সংস্কারকে তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন আর সেই সংস্কারকেও তিনি বিভিন্ন বৃত্তিগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন হিসেবেই দেখছেন —-
“আমাদের সর্ব্বাঙ্গসম্পন্ন হিন্দুধর্ম্মের ইতিহাস আলোচনা করিলে দেখিতে পাইবে যে, ইহার যত পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছে, তাহা কেবল ইহাকে সর্ব্বাঙ্গসম্পন্ন করিবার চেষ্টার ফল। ইহার প্রথমাবস্থা ঋগ্বেদসংহিতার ধর্ম্ম আলোচনায় জানা যায়। যাহা শক্তিমান্ বা উপকারী বা সুন্দর, তাহারই উপাসনা এই আদিম বৈদিক ধর্ম্ম। তাহাতে আনন্দভাগ যথেষ্ট ছিল, কিন্তু সতের ও চিতের উপাসনার, অর্থাৎ জ্ঞান বা ধ্যানের অভাব ছিল। এই জন্য কালে তাহা উপনিষদ্সকলের দ্বারা সংশোধিত হইল। উপনিষদের ধর্ম্ম-চিন্ময় পরব্রহ্মের উপাসনা। তাহাতে জ্ঞানের ও ধ্যানের অভাব নাই। কিন্তু আনন্দাংশের অভাব আছে। ব্রহ্মানন্দপ্রাপ্তিই উপনিষদ্ সকলের উদ্দেশ্য বটে, কিন্তু চিত্তরঞ্জিনী বৃত্তি সকলের অনুশীলন ও স্ফূর্ত্তির পক্ষে সেই জ্ঞান ও ধ্যানময় ধর্ম্মের কোন ব্যবস্থা নাই। বৌদ্ধ ধর্ম্মে উপাসনা নাই। বৌদ্ধেরা সৎ মানিতেন না। এবং তাঁহাদের ধর্ম্মে আনন্দ ছিল না। এই তিন ধর্ম্মের একটিও সচ্চিদানন্দপ্রয়াসী হিন্দুজাতির মধ্যে অধিক দিন স্থায়ী হইল না। এই তিন ধর্ম্মের সারভাগ গ্রহণ করিয়া পৌরাণিক হিন্দুধর্ম্ম সংগঠিত হইল। তাহাতে সতের উপাসনা, চিতের উপাসনা এবং আনন্দের উপাসনা প্রচুর পরিমাণে আছে। বিশেষ আনন্দভাগ বিশেষরূপে স্ফূর্ত্তি প্রাপ্ত হইয়াছে। ইহাই জাতীয় ধর্ম্ম হইবার উপযুক্ত, এবং এই কারণেই সর্ব্বাঙ্গসম্পন্ন হিন্দুধর্ম্ম অন্য কোন অসম্পূর্ণ বিজাতীয় ধর্ম্ম কর্ত্তৃক স্থানচ্যুত বা বিজিত হইতে পারে নাই। “
উপন্যাসে ধর্মতত্ত্বের ব্যবহারিক প্রয়োগ
বঙ্কিমচন্দ্র কেবল তত্ত্বকথা বলেই ক্ষান্ত হননি, তাঁর কালজয়ী উপন্যাসগুলোতে এই ‘অনুশীলন ধর্ম’ বা কর্মযোগের বাস্তব ও জীবন্ত রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন।
আনন্দমঠ (১৮৮২) উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন কীভাবে আধ্যাত্মিক সাধনা ও জাগতিক কর্মযোগের মিলন ঘটাতে হয়।
উপন্যাসের ‘সন্তান দল’ হলো বঙ্কিমচন্দ্রের অনুশীলন ধর্মের বাস্তব রূপ। তারা সংসার ত্যাগী বৈরাগী নয়, বরং দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের জন্য অস্ত্রধারী যোদ্ধা।
বঙ্কিমচন্দ্র এখানে ‘জগদ্ধাত্রী’ (যা ছিল), ‘কালী’ (যা হয়েছে) এবং ‘দুর্গা’ (যা ভবিষ্যতে হবে)—এই তিন রূপে দেশকে ঈশ্বরের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মতত্ত্বে যা ‘জগৎপ্রীতি’, আনন্দমঠে তা ‘দেশপ্রীতি’ হয়ে ধরা দিয়েছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নিষ্কাম কর্মযোগের এমন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োগ বাংলা সাহিত্যে অতুলনীয়।
‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের নায়ক সত্যানন্দ মায়ের পরমবৈভবশালী রূপ দেখতে চায় , দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচন করতে চায়। সত্যানন্দের প্রশ্ন –“আমার মনস্কাম কি সিদ্ধ হইবে না?”।
উত্তর এল — “তোমার পণ কি?”
প্রত্যুত্তরে বলিল, “পণ আমার জীবনসর্ব্বস্ব।”
প্রতিশব্দ হইল, “জীবন তুচ্ছ; সকলেই ত্যাগ করিতে পারে।”
“আর কি আছে? আর কি দিব?”
তখন উত্তর হইল, “ভক্তি।”
বঙ্কিমচন্দ্র ‘ধর্মতত্ত্ব( অনুশীলন)’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেশভক্তিকেই সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন পরবর্তীকালে অর্থাৎ উপন্যাসগুলোতে বিভিন্ন ঘটনাবলী ও চরিত্রের মাধ্যমে যা বলেছেন তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন ‘ধর্মতত্ত্ব( অনুশীলন)-এ।
সীতারাম (১৮৮৭) উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন অনুশীলন ধর্মের বিচ্যুতি ঘটলে মানুষের কী পরিণতি হয়।
সীতারাম চরিত্রটি শুরুতে একজন আদর্শ রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, যিনি প্রজাদের রক্ষার্থে এবং ‘ধর্মরাজ্য’ বা হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করেন। এটি ছিল তাঁর কার্যকারিণী ও জ্ঞানার্জ্জনী বৃত্তির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বঙ্কিমচন্দ্র ‘সীতারাম’-এর প্রথমা ও পরিত্যক্তা স্ত্রী’র মুখ দিয়ে বলিয়েছেন —–
“শ্রী। দেখ, দেবতা আছে, ধর্ম আছেন, নারায়ণ আছেন। কিছুই মিথ্যা নয়। তুমি দীন দুঃখীকে বাঁচাইলে তোমার কখনও অমঙ্গল হইবে না। হিন্দুকে হিন্দু না রাখিলে কে রাখিবে? ”
সীতারাম অনেকক্ষণ ভাবিল। পরে বলিল, “তুমি সত্যই বলিয়াছ, হিন্দুকে হিন্দু না রাখিলে কে রাখিবে? আমি তোমার কাছে স্বীকার করিলাম। গঙ্গারামের জন্য আমি যথাসাধ্য করিব |”
অর্থাৎ, ধর্মের অনুশীলনের মাধ্যমে স্বদেশভক্তির জাগরণ আর ধর্মের অনুশীলকারীদের তথা হিন্দু জাতির রক্ষা করতে হলে কি ধরনের চরিত্র প্রয়োজন, বৃত্তিগুলোর মধ্যে কিরকম সামঞ্জস্য প্রয়োজন তাই-ই ‘সীতারাম’ এর উপজীব্য।
পরবর্তীকালে অপর দুই স্ত্রী গৃহে থাকলেও সন্ন্যাসব্রত গ্ৰহণ করা ‘শ্রী’ এর প্রতি তীব্র আসক্তি বা চিত্তরঞ্জিনী বৃত্তির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে তাঁর বৃত্তিসমূহের সামঞ্জস্য নষ্ট হয় আর রাষ্ট্রধর্মের অবমাননা হয়। বঙ্কিমচন্দ্র এখানে দেখালেন, একজন নেতার যদি আত্মসংযম এবং বৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে তাঁর মহৎ উদ্দেশ্য বা ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন কীভাবে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।
প্রাচীনকালে ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যকাররা যেভাবে বেদের অপব্যাখ্যা দূর করে সমাজকে সঠিক পথ দেখিয়েছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র উনিশ শতকে এসে ঠিক সেই কাজটিই করলেন। তাঁর প্রধান লড়াই ছিল দুটি বিষয়ে— সনাতন ধর্মের অপব্যাখ্যা দূর করা এবং শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রকে কলঙ্কমুক্ত করা।
তৎকালীন সমাজে শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে দু ধরণের বিভ্রান্তি ছিল— ইউরোপীয় পণ্ডিত ও মিশনারিরা কৃষ্ণকে একজন ‘লম্পট’, ‘লড়াকু’ বা পুরাণের ‘কাল্পনিক’ চরিত্র হিসেবে তুলে ধরত; অন্যদিকে সাধারণ হিন্দু সমাজ কৃষ্ণ বলতে কেবল বৃন্দাবনের রাসলীলা, মাখন চুরি বা রাধাকৃষ্ণের প্রেমকেই বুঝত।
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘কৃষ্ণচরিত্র’ গ্রন্থে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক, ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতিতে মহাভারত ও পুরাণসমূহ বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেন – শ্রী কৃষ্ণ কোনো কাল্পনিক রূপকথা নন, তিনি এক ঐতিহাসিক মহাপুরুষ।
ইউরোপীয়দের অন্ধ অনুকরণ আর কোনো ঘটনার ঐতিহাসিকতা নির্ণয়ে ইউরোপীয়দের দ্বিচারিতা সম্পর্কে সাবধান করেছেন —
“বিলাতী বিদ্যার একটা লক্ষণ এই যে, তাঁহারা স্বদেশে যাহা দেখেন, মনে করেন বিদেশে ঠিক তাই আছে। তাঁহারা Moor ভিন্ন অগৌরবর্ণ কোন জাতি জানিতেন না, এজন্য এদেশে আসিয়া হিন্দুদিগকে “Moor” বলিতে লাগিলেন। সেইরূপ স্বদেশে Epic কাব্য ভিন্ন পদ্যে রচিত আখ্যানগ্রন্থ দেখেন নাই, সুতরাং ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা মহাভারত ও রামায়ণের সন্ধান পাইয়াই ঐ দুই গ্রন্থ Epic কাব্য বলিয়া সিদ্ধান্ত করিলেন। যদি কাব্য, তবে আর উহার ঐতিহাসিকতা কিছু রহিল না, সব এক কথায় ভাসিয়া গেল। ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা এ বোল কিয়ৎ পরিমাণে ছাড়িয়াছেন, কিন্তু তাঁহাদের দেশী শিষ্যেরা ছাড়েন নাই।
*কেন, মহাভারতকে সাহেবরা কাব্যগ্রন্থ বলেন, তাহা তাঁহারা ঠিক বুঝান নাই। উহা পদ্যে রচিত বলিয়া এরূপ বলা হয়, এমত হইতে পারে না, কেন না, সর্বপ্রকার সংস্কৃত গ্রন্থই পদ্যে রচিত;—বিজ্ঞান, দর্শন, অভিধান, জ্যোতিষ, চিকিৎসা শাস্ত্র, সকলই পদ্যে প্রণীত হইয়াছে। তবে এমন হইতে পারে, মহাভারতে কাব্যাংশ বড় সুন্দর;—ইউরোপীয়েরা যে প্রকার সৌন্দর্য Epic কাব্যের লক্ষণ বলিয়া নির্দেশ করেন, সেই জাতীয় সৌন্দর্য উহাতে বহুল পরিমাণে আছে বলিয়া, উহাকে Epic বলেন। কিন্তু বিবেচনা করিয়া দেখিলে ঐ জাতীয় সৌন্দর্য অনেক ইউরোপীয় মৌলিক ইতিহাসেও আছে। ইংরেজের মধ্যে মেকলে, কার্লাইল্ ও ফ্রুদের গ্রন্থে, ফরাসীদিগের মধ্যে লামার্তীন্ ও মিশালার গ্রন্থে, গ্রীকদিগের মধ্যে থুকিদিদিসের গ্রন্থে, এবং অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থে আছে। মানব-চরিত্রই কাব্যের শ্রেষ্ঠ উপাদান; ইতিহাসবেত্তাও মনুষ্যচরিত্রের বর্ণন করেন; ভাল করিয়া তিনি যদি আপনার কার্য সাধন করিতে পারেন, তবে কাজেই তাঁহার ইতিহাসে কাব্যের সৌন্দর্য আসিয়া উপস্থিত হইবে। সৌন্দর্যহেতু ঐ সকল গ্রন্থ অনৈতিহাসিক বলিয়া পরিত্যক্ত হয় নাই—মহাভারতও হইতে পারে না।” *
বঙ্কিমচন্দ্র ‘কৃষ্ণচরিত্র’ – এর শুরুতেই স্পষ্ট করেছেন —-“আমি নিজেও কৃষ্ণকে স্বয়ং ভগবান্ বলিয়া দৃঢ় বিশ্বাস করি; পাশ্চাত্য শিক্ষার পরিণাম আমার এই হইয়াছে যে, আমার সে বিশ্বাস দৃঢ়ীভূত হইয়াছে। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের যথার্থ কিরূপ চরিত্র পুরাণেতিহাসে বর্ণিত হইয়াছে, তাহা জানিবার জন্য, আমার যতদূর সাধ্য, আমি পুরাণ ইতিহাসের আলোচনা করিয়াছি। তাহার ফল এই পাইয়াছি যে, কৃষ্ণসম্বন্ধীয় যে সকল পাপোপাখ্যান জনসমাজে প্রচলিত আছে, তাহা সকলই অমূলক বলিয়া জানিতে পারিয়াছি, এবং উপন্যাসকারকৃত কৃষ্ণসম্বন্ধীয় উপন্যাস সকল বাদ দিলে যাহা বাকি থাকে, তাহা অতি বিশুদ্ধ, পরমপবিত্র, অতিশয় মহৎ, ইহাও জানিতে পারিয়াছি। জানিয়াছি—ঈদৃশ সর্বগুণান্বিত, সর্বপাপসংস্পর্শশূন্য, আদর্শ চরিত্র আর কোথাও নাই। কোন দেশীয় ইতিহাসেও না, কোন দেশীয় কাব্যেও না।”
শ্রীকৃষ্ণ , বঙ্কিমচন্দ্রের ‘অনুশীলন ধর্ম’-এর সর্বশ্রেষ্ঠ এবং একমাত্র বাস্তব উদাহরণ— যেখানে সমস্ত মানবিক বৃত্তি (শারীরিক, মানসিক, রাজকীয়, আধ্যাত্মিক) পূর্ণতা পেয়েছিল।
বঙ্কিমচন্দ্র ক্ষুরধার যুক্তিতে দেখান যে, মহাভারতের মূল স্তরে (Core text) কৃষ্ণের কোনো পরকীয়া বা অনৈতিকতার স্থান নেই; পরবর্তীকালের প্রক্ষিপ্ত বা কাল্পনিক গল্পের মাধ্যমে কৃষ্ণের চরিত্রকে বিকৃত করা হয়েছে।
বঙ্কিমচন্দ্র কৃষ্ণকে উপস্থাপন করলেন একজন শ্রেষ্ঠ কূটনীতিবিদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যোদ্ধা এবং অর্জুনকে গীতার নিষ্কাম কর্মযোগের শিক্ষা দেওয়া মহান গুরু হিসেবে।
বঙ্কিমচন্দ্র সাধারণ মানুষকে বোঝালেন যে, হিন্দুধর্ম মানে কেবল ছোঁয়াছুঁয়ি বিচার, উপবাস বা অলৌকিকতায় বিশ্বাস নয়। ধর্ম হলো অন্তরের ভক্তি এবং বাইরের কর্মের সমন্বয়।
প্রাচীন ভাষ্যকাররা যেখানে মুক্তির পথ হিসেবে ‘জ্ঞান’ বা ‘ভক্তি’-কে আলাদা করে দেখাতেন, বঙ্কিমচন্দ্র সেখানে পাশ্চাত্যের পজিটিভিজম (Auguste Comte-এর দর্শন) এবং গীতার কর্মযোগের সমন্বয় ঘটিয়ে দেখালেন যে— মানুষের সেবা এবং দেশের সেবাই ঈশ্বরের সর্বোত্তম আরাধনা।
ব্রহ্মসূত্রের প্রাচীন ভাষ্যকাররা যদি সনাতন ধর্মের “দার্শনিক ভিত্তি” স্থাপন করে থাকেন, তবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেই দর্শনের “আধুনিক ও জাতীয়তাবাদী ব্যবহারিক রূপ” দিয়েছিলেন। তিনি ধর্মের নামে চলা জড়তাকে ভেঙে চুরমার করে এক গতিশীল, আত্মবিশ্বাসী এবং স্বদেশভক্তিকে সর্বোচ্চ স্থান দানকারী হিসেবে হিন্দু ধর্মকে উপস্থাপন করে বলেছিলেন— ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিনী’ । লেখনীর মাধ্যমে অধর্মের বিনাশকারী শ্রীকৃষ্ণকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্রের জন্ম দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র আধুনিক ভারতের জাতীয় জীবনে এক চিরস্মরণীয় আচার্য হিসেবে নিজের আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।
দেশভক্তির জাগরণ ঘটাতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকা সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের সাহচর্যে থাকা বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ —-
“স্বয়ং ঋষি শ্রীঅরবিন্দ বলেছেন-‘Earlier Bankim was a novelist only, later Bankim is a Rishi’ । ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় এই বাণীকে ছড়িয়ে দিয়েছেন যে, বঙ্কিমচন্দ্র এই যুগের ঋষি।*
*আজ থেকে পঁচাত্তর (৭৫) বৎসর পূর্বে ১৯০১ খ্রীষ্টাব্দে স্বামীজির দর্শন লাভ এবং বাক্যালাপের পরম সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেই দুর্লভ দর্শনের সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন-“Read Bankim Chandra-Bankim Chandra-and Bankim Chandra only.”।
হিন্দু ধর্মের উত্থানেই ভারতবর্ষের উত্থান, মানবতার উত্থান মনে করে যারা হিন্দু ধর্মকে যুগানুকূল করতে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন আর ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্য রচনা করেছিলেন তাদের ‘জগদগুরু’ নামে আখ্যায়িত করা হয় । সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘ধর্মতত্ত্ব’ , ‘শ্রী কৃষ্ণচরিত্র’ , ‘আনন্দমঠ’ , ‘সীতারাম’ , ‘রাজসিংহ’ , দেবী চৌধুরানী ইত্যাদি রচনার মধ্যে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে বিভ্রান্তি দূরীকরণ, ঐতিহাসিকতার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রোত্থানের জন্য ব্যক্তি চরিত্র – রাষ্ট্র চরিত্রের যুগপৎ বিকাশের পথ প্রদর্শনের সুস্পষ্ট প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। তিনি যে সে প্রয়াসে সফল হয়েছিলেন তার প্রমাণ ‘বন্দেমাতরম্’ মন্ত্র কে কন্ঠস্থ করে প্রাণ বলিদানকারী শত শত বিপ্লবী।
পিন্টু সান্যাল

