আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক-ছাত্রী ধর্ষণ ও খুনের মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)-এর ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। গত ২১ মে হাইকোর্ট যে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল, সিবিআই সেই অনুযায়ী কোনো কাজ করেনি বলে পর্যবেক্ষণ আদালতের।
বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিতে বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের ডিভিশন বেঞ্চ সিবিআই-কে নজিরবিহীনভাবে ভর্ৎসনা করে প্রশ্ন তোলে, “সিবিআই কি হাইকোর্টেরও উপরে? আমাদের কি সিবিআইয়ের থেকে মামলা নিয়ে নিতে হবে?” অন্যদিকে, তদন্তের এই শ্লথ গতিতে হতাশ নির্যাতিতার পরিবার দাবি জানিয়েছে, সিবিআই না পারলে মামলাটি সিআইডি (CID)-কে হস্তান্তর করা হোক।
“১ বছর আট মাস ধরে তদন্ত একই জায়গায়” — তীব্র ক্ষোভ আদালতের
এদিনের শুনানিতে ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও গত এক মাসে তদন্তের কোনো আশাতীত অগ্রগতি হয়নি। আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলি নিচে দেওয়া হলো:
- তদন্তের স্থবিরতা: ২০২৪ সালের অক্টোবরে আরজি কর মামলায় চার্জশিট পেশ করা হয়েছিল। হাইকোর্টের মতে, “তারপর থেকে গত ১ বছর আট মাস ধরে তদন্ত একই জায়গায় রয়েছে। কী করছে সিবিআই? আদালতের সময় নষ্ট করা হয়েছে।”
- দায়িত্বজ্ঞানহীনতা: বিচারপতি শম্পা সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সেমিনার রুম সম্পূর্ণ নষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু তথ্যপ্রমাণ নষ্টের বিষয়ে কোনো তদন্তই হয়নি। একই ব্যক্তিকে বারবার পরীক্ষা করা হচ্ছে। অগ্রগতি কোথায়? এটা দায়িত্বজ্ঞানহীন সিবিআই অফিসারের কাজ।”
- ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব ও সিবিআই-এর ইগো: আদালতের প্রশ্ন, “এতদিনের তদন্তে কী তথ্য বা নথি সংগ্রহ করল সিবিআই? রিপোর্টে শুধু ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ কাজ করেছে বলা ছাড়া আর নতুন কিছু নেই কেন? কারা সিবিআইয়ের হাত বেঁধে রেখেছে? সিবিআইয়ের এত কিসের ইগো? আমরা তো বিচার দিতে চেয়েছিলাম।”
ভর্ৎসনার মুখে সিবিআই-এর আইনজীবী আদালতে সাফাই দিয়ে বলেন, “হাইকোর্টের নির্দেশ বুঝতে হয়তো কোথাও ভুল হয়েছে। তবে তদন্ত চলছে এবং প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।” এরপরই আদালত গত ২১ মে দেওয়া নির্দেশটি পুনরায় সিবিআই-এর কাছে ব্যাখ্যা করে।
সিআইডি তদন্তের দাবি নির্যাতিতার পরিবারের
সিবিআই-এর তদন্ত প্রক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ নির্যাতিতার পরিবার জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় সংস্থা যদি সঠিক পথে তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এই মামলা রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তথা সিআইডি-কে দেওয়া হোক। এর আগেও সিবিআই তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে বারবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল পরিবারটি। আগের শুনানিতেও সিবিআই-কে আদালতের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল যে, তদন্ত শেষ না হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে ঘটনাস্থলে বাইরের লোকজন ঢুকে পড়ল? আদালত তখন সেমিনার রুমসহ স্পর্শকাতর জায়গাগুলি দ্রুত ‘সিল’ করার নির্দেশ দিয়েছিল।
২১ মে-র নির্দেশ মনে করাল হাইকোর্ট
গত ২১ মে হাইকোর্ট নির্যাতিতার পরিবারের দাবিগুলি খতিয়ে দেখতে সিবিআই-এর জয়েন্ট ডিরেক্টরের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। আদালত বৃহস্পতিবার সিবিআই-কে সেই পুরনো নির্দেশিকা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়ে জানায়:
- সিবিআই-কে পুনরায় ঘটনাস্থলে যেতে হবে এবং নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
- শুধু প্রমাণ লোপাট নয়, ঘটনার দিন রাতে ওই চিকিৎসক-ছাত্রীর সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে রাতের খাবার খাওয়া থেকে শুরু করে শেষকৃত্য (দাহ) সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ ঘটনাক্রম নতুন করে খতিয়ে দেখতে হবে।
- প্রয়োজনে আবেদনকারী বা অন্য যে কাউকেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে কেন্দ্রীয় সংস্থা।
মামলার প্রেক্ষাপট
প্রায় দু’বছর আগে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এক চিকিৎসক-ছাত্রীকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুন করা হয়। এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়কে ইতিমধ্যে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। তবে ঘটনার নেপথ্যে থাকা অন্যান্য রহস্য ও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ তুলে পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হয় পরিবার।
উল্লেখ্য, এর আগে কলকাতা হাইকোর্টের তিনটি পৃথক বেঞ্চ এই মামলার শুনানি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল। গত ১২ মে বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার বেঞ্চ মামলাটি ছাড়ার পর, প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের বেঞ্চ জানায় যে নতুন বেঞ্চে এই শুনানি হবে। বর্তমানে বিচারপতি শম্পা সরকার ও বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির বিচার চলছে। এই মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ৬ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়েছে।

