আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি রূপায়ণের লক্ষ্যে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করল ভারত ও আমেরিকা। বুধবার ফ্রান্সের এভিয়ঁ-লে-বঁ শহরে আয়োজিত ৫২তম জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ববৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে সাক্ষাতের পর, প্রায় ১৬ মাস পর এই প্রথম দুই রাষ্ট্রপ্রধান মুখোমুখি হলেন।
বৈঠক শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী মোদীর দ্বিপাক্ষিক দর কষাকষির দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভারতের পাশে থাকার জোরালো বার্তা দেন।
মোদীর ‘কূটনৈতিক’ দক্ষতার প্রশংসা ট্রাম্পের
প্রধানমন্ত্রী মোদীর ব্যক্তিত্ব ও আলোচনার দক্ষতার প্রশংসা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে বলেন,
“তিনি দেখতে অত্যন্ত সুন্দর একজন মানুষ, যেন একজন দেবদূত। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত কঠিন এবং একজন ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দ্বী।”
বাণিজ্য চুক্তির শর্ত নির্ধারণে মোদী অত্যন্ত দক্ষ বলে উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর পাশাপাশি ভারতের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করে তিনি ঘোষণা করেন, “নরেন্দ্র মোদীর ভারতে যদি কোনো হামলা হয়, তবে নয়াদিল্লির পাশে দাঁড়াবে আমেরিকা। যদি কেউ সেই মানুষটিকে (মোদী) আক্রমণ করে, আমরা সেখানে উপস্থিত থাকব।”
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গ
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালীর কাছে ওমান উপসাগরে তিনটি ভারতীয় নাবিকবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে, যার পেছনে মার্কিন সেনার দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। মঙ্গলবার জি-৭ বৈঠকের মূল মঞ্চে এই বিষয়টি উত্থাপন করার পর, বুধবারের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি ট্রাম্পের কাছে গুরুত্ব সহকারে তোলেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানান যে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির স্বার্থে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি এবং সমুদ্রপথে অবাধ যাতায়াতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পাল্টা সৌজন্য হিসেবে, ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যে (পশ্চিম এশিয়া) শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন মোদী।
সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নতুন গতি
গত ১৬ মাসে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একাধিক বিষয়ে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছিল। ‘অপারেশন সিঁদুর’-পরবর্তী ভারত-পাক যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি, রাশিয়ার থেকে ভারতের তেল ক্রয়, মার্কিন শুল্কনীতি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির খসড়া নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়। এমনকি ট্রাম্প এক সময়ে ভারতকে ‘মৃত অর্থনীতি’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
তবে সমস্ত তিক্ততা সরিয়ে রেখে বুধবারের বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন,
“গত বছর ওয়াশিংটনে সাক্ষাতের পর থেকে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটি নতুন গতি ও উদ্দীপনা এসেছে। এটি অত্যন্ত আনন্দের যে আমরা দুই পক্ষ যৌথভাবে অভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি এবং তা অর্জনে দ্রুত এগিয়ে চলেছি।”
ট্রাম্পের ভারত সফর ও কোয়াড সমীকরণ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে’ তিনি ভারত সফরে যাবেন। নয়াদিল্লি গত কয়েক মাস ধরেই ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ‘কোয়াড’ (চতুর্দেশীয় অক্ষ) শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই আশ্বাসকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

