বহিষ্কৃত বিধায়ককে কীভাবে বিরোধী দলনেতা করা হলো? বিধানসভা মামলায় স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন হাই কোর্টের

বহিষ্কৃত বিধায়ককে কীভাবে বিরোধী দলনেতা করা হলো? বিধানসভা মামলায় স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন হাই কোর্টের

দল থেকে বহিষ্কার করার পরেও কোন যুক্তিতে বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধান বিরোধী দলনেতা হিসেবে বেছে নিলেন বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু? বিধানসভার অলিন্দ থেকে আদালত কক্ষ পর্যন্ত গড়ানো হাই প্রোফাইল মামলায় এবার এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তুলল কলকাতা হাই কোর্ট।

তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে পাঠানো প্রথম চিঠিটিকে গুরুত্ব না দিয়ে, পরবর্তীতে আসা দ্বিতীয় চিঠিটি কেন গ্রহণ করা হলো—সেই প্রক্রিয়া নিয়ে বুধবার শুনানির সময় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারপতি কৃষ্ণ রাও। বালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের দায়ের করা এই মামলার দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত রায়দান আপাতত স্থগিত রেখেছে। বৃহস্পতিবার সকালে বিচারপতি রাও এই বিষয়ে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করতে পারেন।

মামলার প্রেক্ষাপট ও স্পিকারের সিদ্ধান্ত

এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ৮০টি আসনে জয়লাভ করে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দলের চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত করেন এবং গত ৯ মে স্পিকারকে এই মর্মে একটি চিঠি দেওয়া হয়।

অভিযোগ, প্রথম চিঠিটির ভিত্তিতে স্পিকার রথীন্দ্র বসু কোনো পদক্ষেপ করেননি। পরবর্তীতে ওই চিঠিতে বিধায়কদের স্বাক্ষর জালের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যেই দলবিরোধী কাজের অভিযোগে ১ জুন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল নেতৃত্ব।

বিতর্কের সূত্রপাত ৩ জুন, যখন তৃণমূলের একদল বিক্ষুব্ধ বিধায়ক স্পিকারকে চিঠি দিয়ে দল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা করার দাবি জানান। স্পিকার দ্রুত সেই চিঠির ভিত্তিতে পদক্ষেপ করেন এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করেন। স্পিকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘বেআইনি’ আখ্যা দিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।

শুনানিতে বিচারপতির কড়া পর্যবেক্ষণ

বুধবার শুনানির সময় স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি কৃষ্ণ রাও। তাঁর প্রধান পর্যবেক্ষণগুলো হলো:

  • শুনানির অভাব: প্রথম আবেদনের পর স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে স্পিকারের উচিত ছিল দু’পক্ষকেই ডেকে শুনানি করা। প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি (Principle of Natural Justice) এখানে লঙ্ঘন করা হয়েছে।
  • বহিষ্কৃত ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি: ১ জুন দল থেকে বহিষ্কারের চিঠি পাওয়ার পর, ৩ জুন সেই বহিষ্কৃত ব্যক্তিকেই কীভাবে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো, তা অত্যন্ত বড় প্রশ্ন।
  • সত্যতা যাচাই: প্রথম চিঠিতে ৭৮ জন বিধায়কের সমর্থনের দাবি ছিল। সেই দাবির সত্যতা যাচাই না করে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আদালতে তিন পক্ষের সওয়াল-জবাব

আদালতে শুনানির সময় স্পিকার, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র আইনি লড়াই চলে। মূল যুক্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. স্পিকারের পক্ষে (আইনজীবী বিল্বদল ভট্টাচার্য):

তিনি দাবি করেন, প্রথম চিঠিতে শুধু শোভনদেবের নাম ছিল, কিন্তু কোনো বিধায়কের স্বাক্ষর বা সেটি আদৌ পরিষদীয় দলের বৈঠক ছিল কিনা তার প্রমাণ ছিল না। উল্টো সই জালের অভিযোগ পাওয়ায় স্পিকার হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর করান। অন্যদিকে, দ্বিতীয় চিঠির সময় ৫৮ জন বিধায়ক সশরীরে স্পিকারের সামনে হাজির হয়ে ঋতব্রতকে সমর্থন জানান এবং নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেন। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের নির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় স্পিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

২. ঋতব্রতের পক্ষে (আইনজীবী জয়দীপ কর):

তাঁর যুক্তি, ৬ মে-র প্রস্তাবপত্রে কোনো স্বাক্ষর না থাকায় স্পিকার আরও নথি চেয়েছিলেন। যেহেতু বিদ্রোহী বিধায়কদের বিরুদ্ধে এখনও দলত্যাগবিরোধী আইনে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তাই তাঁরা এখনও দলেরই সদস্য। তাছাড়া, এই ক্ষেত্রে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন থাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং স্পিকারের এই সাংবিধানিক সিদ্ধান্তে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।

৩. শোভনদেবের পক্ষে (আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়):

তিনি স্পিকার ও ঋতব্রতের যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে জানান, সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় অনুযায়ী ‘রাজনৈতিক দল’ (Political Party) এবং ‘পরিষদীয় দল’ (Legislative Party) দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিরোধী দলনেতা কে হবেন তা রাজনৈতিক দল ঠিক করে, বিধায়কদের অভ্যন্তরীণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সেখানে বিবেচ্য হতে পারে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মূল দল শোভনদেবকে মনোনীত করেছিল। কিছু বিধায়ক আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করে দলের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারেন না। সর্বোপরি, দল থেকে বহিষ্কৃত কোনো ব্যক্তিকে বিরোধী দলনেতা ঘোষণা করা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।

সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত এই মামলার রায়দান স্থগিত রেখেছে। রাজ্যের রাজনৈতিক ও আইনি মহলের নজর এখন বৃহস্পতিবারের রায়ের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.