পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে বিধানসভার স্পিকারের ভূমিকা ও এক্তিয়ার নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তুলল কলকাতা হাইকোর্ট। একই রাজনৈতিক দল থেকে আসা দুটি ভিন্ন প্রস্তাবের মধ্যে স্পিকার ঠিক কোন পদ্ধতিতে এক পক্ষের প্রস্তাবকে বেছে নিলেন, মঙ্গলবার শুনানির সময় তা জানতে চান বিচারপতি কৃষ্ণ রাও। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম প্রস্তাবে স্পিকার কেন সাড়া দেননি, সেই বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে আদালত।
বুধবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন রাজ্যের বর্তমান বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য শুনবে হাইকোর্ট।
মামলার প্রেক্ষাপট
বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসনে জয়লাভ করে। নির্বাচনের পর তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করেন। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে সেই প্রস্তাব স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু তার কয়েক দিন পরেই স্পিকার তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করেন। স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।
আদালতে বিচারপতি ও স্পিকারের আইনজীবীর সওয়াল-জবাব
মঙ্গলবার মামলার শুনানিতে রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল (এএজি) বিল্বদল ভট্টাচার্য সওয়াল করেন যে, বিরোধী দলনেতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্পিকারের ভূমিকা সীমিত এবং তিনি বিরোধী দলের অন্দরে থাকা বিধায়কদের মধ্য থেকেই একজনকে এই পদে নিযুক্ত করেন।
শুনানি চলাকালীন বিচারপতি ও স্পিকারের আইনজীবীর মধ্যে মূল যে সওয়াল-জবাব হয়, তা নীচে তুলে ধরা হলো:
- বিচারপতি রাও: স্পিকারের কাছে মোট কতগুলি প্রস্তাব জমা পড়েছিল?
- স্পিকারের আইনজীবী: মোট দুটি প্রস্তাব জমা পড়েছিল।
- বিচারপতি রাও: বিরোধী দলনেতা নির্বাচন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের দেওয়া মূল প্রস্তাব কি স্পিকার এভাবে এড়িয়ে যেতে পারেন? অথবা তাদের বক্তব্য না শুনেই অন্য কোনও নির্দেশ জারি করতে পারেন? একই রাজনৈতিক দল থেকে দুটি প্রস্তাব এলে স্পিকারের ঠিক কী করণীয়? তিনি কি প্রথম প্রস্তাবটি বাতিল করবেন? স্পিকার কি এই বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?
- বিল্বদল ভট্টাচার্য: বিরোধী দল থেকেই বিরোধী দলনেতা বাছাই করা হয়েছে। তবে তৃণমূলের পক্ষ থেকে আসা প্রথম প্রস্তাবটিতে বিধায়কদের সই জালিয়াতি করার অভিযোগ উঠেছিল।
- বিচারপতি রাও: স্পিকারের কাছে কোনও প্রস্তাব জমা পড়ার পর তা নিয়ে আপত্তি এলে স্পিকারের কাজ কী? তিনি কি সেই প্রস্তাব অনুসন্ধান করে দেখেন? তিনি নিজের চেম্বারে বসে কীভাবে নির্ধারণ করলেন যে কে ঠিক আর কে ভুল?
- বিল্বদল ভট্টাচার্য: স্পিকারের কাজ কোনও ‘রাবার স্ট্যাম্পের’ মতো নয়। সই জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান করেছিলেন। পরবর্তীতে এই বিষয়ে হেয়ার স্ট্রিট থানায় একটি এফআইআর (FIR)-ও দায়ের করা হয়। তৃণমূলের ৫৮ জন ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক স্পিকারের কাছে সই জালের বিষয়টি জানান এবং তাঁদের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক রয়েছেন দাবি করে সই-সহ নতুন প্রস্তাব জমা দেন। তার পরেই নতুন বিরোধী দলনেতা নিয়োগ করা হয়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর বিচারপতি কৃষ্ণ রাও মন্তব্য করেন, সই জালিয়াতির বিতর্কের সত্যতা বা মিথ্যার গভীরে আদালত এই মুহূর্তে ঢুকতে চাইছে না। বিদ্রোহী বিধায়কদের অভিযোগ নিয়েও আদালত কোনও মন্তব্য করবে না।
তবে স্পিকারের প্রক্রিয়াগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি বলেন, “প্রথম প্রস্তাবটি পাওয়ার পরে কেন স্পিকার নীরব ছিলেন? কেন তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত স্পষ্ট জানাননি? এক পক্ষের প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল না করে, অন্য পক্ষকে কীভাবে তিনি বেছে নিলেন? তিনি কি আগে থেকেই জানতেন যে আরেকটি প্রস্তাব আসতে চলেছে?”
মঙ্গলবার স্পিকারের পক্ষের সওয়াল সম্পূর্ণ হয়নি। বুধবার মামলার পরবর্তী শুনানিতে স্পিকারের অবশিষ্ট বক্তব্য শোনার পাশাপাশি বর্তমান বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যও খতিয়ে দেখবে কলকাতা হাইকোর্ট।

