সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ‘আপত্তিকর, অসম্মানজনক এবং নারী-বিদ্বেষী’ আচরণের অভিযোগ তুলে তাঁকে লোকসভা থেকে বহিষ্কারের দাবি জানালেন ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-এর নেত্রী তথা সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। এই মর্মে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন তিনি। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের অভিযোগ, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু তাঁকেই নন, সংসদের অন্যান্য মহিলা সাংসদদেরও ক্রমাগত হেনস্থা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ করে চলেছেন।
লোকসভার স্পিকারকে দেওয়া চিঠিতে গুরুতর অভিযোগ
স্পিকার ওম বিড়লাকে লেখা চিঠিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন, শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে মহিলা জনপ্রতিনিধিরা সংসদীয় কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করতে অস্বস্তিবোধ করছেন।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন:
- ধারাবাহিক হেনস্থা: কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় একটি ঘটনা নয়, বরং বারবার রাজনৈতিক ও সংসদীয় তর্কবিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও হেনস্থা করে চলেছেন।
- বিধিভঙ্গ: তাঁর এই আচরণ লোকসভার ৩৪৯ নম্বর ধারার পরিপন্থী এবং সামগ্রিকভাবে সংসদকে অবমাননা করার শামিল। একজন সাংসদের কাছ থেকে যে শৃঙ্খলা ও মর্যাদা আশা করা হয়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে তার অভাব রয়েছে।
- অধিকারের অপব্যবহার: সংবিধানের ১০৫ ধারা সাংসদদের বাক্স্বাধীনতা দিলেও, তা কাউকে হেনস্থা করার অধিকার দেয় না।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার স্পিকারের কাছে আর্জি জানিয়েছেন, সংসদের মর্যাদার স্বার্থে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং প্রয়োজনে তাঁকে লোকসভা থেকে বহিষ্কার করা হোক। এর আগে গত ২৮ মে-ও কল্যাণের বিরুদ্ধে মৌখিক হেনস্থা ও নারীবিদ্বেষের অভিযোগ এনে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিলেন তিনি।
পাল্টা আক্রমণে কল্যাণ: নারদ ও সিন্ডিকেট খোঁচা
কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই সমস্ত অভিযোগের তীব্র বিরোধিতা করে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কাকলির রাজনৈতিক সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন:
“২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমি সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতক পদে ছিলাম। মাঝখানে কয়েক মাস ওই দায়িত্বে ছিলাম না। ওঁর আবার কিসের এত কথা? নারদে তো আমি পাঁচ লক্ষ টাকা নিইনি, উনি নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সিন্ডিকেট শব্দের জন্মদাত্রী কে? সকলে জানেন। সেই সিন্ডিকেটের জন্মস্থান রাজারহাট।”
পটভূমি: তৃণমূলের অন্দরে ফাটল ও এনসিপিআই-এর জন্ম
এই সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ ও সাম্প্রতিক দলবদল।
মুখ্যসচেতক পদ নিয়ে অসন্তোষ
২০২৫ সালের অগস্ট মাসে কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের জেরে তৎকালীন তৃণমূলের লোকসভার মুখ্যসচেতক পদ থেকে আচমকা ইস্তফা দিয়েছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ইস্তফা গ্রহণও করেন। তবে সম্প্রতি রাজ্যে বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুনরায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেই লোকসভায় দলের মুখ্যসচেতক পদের দায়িত্ব দেন।
দলে বিদ্রোহ ও দলবদল
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুনরায় এই পদে ফিরিয়ে আনার পর থেকেই ক্ষোভ উগরে দিতে শুরু করেন কাকলি ঘোষ দস্তিদারসহ দলের একাংশ। প্রথম দিকে গুঞ্জন ছিল, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাকলি ঘোষ দস্তিদারেরা তৃণমূলের ভেতরেই একটি আলাদা ‘ব্লক’ তৈরি করবেন এবং স্পিকারের কাছে আসন বদলের আবেদন জানাবেন। কিন্তু সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত রবিবার কাকলি ঘোষ দস্তিদারসহ তৃণমূলের ২০ জন অসন্তুষ্ট সাংসদ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন নতুন রাজনৈতিক দল— ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-তে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দলবদলের পর দুই প্রাক্তন সতীর্থের এই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ লোকসভার অন্দরে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ও সংঘাতের জন্ম দিল।

