সই জাল-কাণ্ড: হাই কোর্টের নির্দেশে ভবানী ভবনে অভিষেক, সাড়ে ৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর মুক্তি

সই জাল-কাণ্ড: হাই কোর্টের নির্দেশে ভবানী ভবনে অভিষেক, সাড়ে ৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর মুক্তি

কলকাতা হাই কোর্টের ডেডলাইন মেনে বৃহস্পতিবার নির্ধারিত সময়ের আগেই ভবানী ভবনে সিআইডি (CID) দফতরে হাজিরা দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভায় সই জাল করার মামলায় এদিন তাঁকে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করেন রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দারা। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাত ১১টা নাগাদ তিনি ভবানী ভবন থেকে বের হন। আদালত তাঁকে তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ দিলেও, আগামী দুই সপ্তাহ তাঁর বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ করা যাবে না বলে সিআইডি-কে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।

বিমানবন্দর থেকে সরাসরি সিআইডি দফতরে

বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টে ২০ মিনিট নাগাদ দিল্লি থেকে কলকাতা বিমানবন্দরে নামেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিমানবন্দর চত্বরে তাঁকে দেখে কয়েকজন ‘চোর-চোর’ স্লোগান দিলেও তিনি সম্পূর্ণ নীরব থাকেন। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কালীঘাটের বাড়িতে যান তিনি। এরপর বিকেল পৌনে ৬টা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে ৫টা ৫০ মিনিটে, অর্থাৎ আদালতের বেঁধে দেওয়া সময় সন্ধ্যা ৬টার আগেই ভবানী ভবনে পৌঁছে যান।

ভবানী ভবনে ঢোকার সময় সংবাদমাধ্যমের সামনে কোনও মন্তব্য করেননি অভিষেক। প্রথমে সোজা সিআইডি দফতরে ঢুকে গেলেও, পরে আবার প্রধান ফটকের দিকে আসেন উপস্থিতির খাতায় সই করার জন্য। সই পর্ব চুকে যাওয়ার পর ফের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ভিতরে প্রবেশ করেন তৃণমূল সাংসদ।

আদালতের রক্ষাকবচ ও মামলার প্রেক্ষাপট

বিধানসভায় সই জাল-কাণ্ডের তদন্তে এর আগে একাধিকবার সিআইডি-র হাজিরা এড়িয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কখনও শারীরিক অসুস্থতা, আবার কখনও রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শহরের বাইরে থাকার যুক্তি দেখিয়েছিলেন তিনি। সিআইডি গ্রেফতার করতে পারে এই আশঙ্কায় অবশেষে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে রক্ষাকবচের আবেদন জানান অভিষেক।

বৃহস্পতিবার বিচারপতি কৌশিক চন্দের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি ছিল। আদালত নির্দেশ দেয়:

  • অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ভবানী ভবনে হাজিরা দিয়ে তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে।
  • সিআইডি এখনই তাঁর বিরুদ্ধে কোনও কঠোর বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ (যেমন গ্রেফতারি) করতে পারবে না।
  • আগামী দুই সপ্তাহ পর এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে, তত দিন পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ জারি থাকবে।

বিতর্কের সূত্রপাত: বিধানসভায় সই জাল-কাণ্ড

তৃণমূলের পরিষদীয় দলের পক্ষ থেকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করে স্পিকারকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সেই চিঠি ঘিরেই যাবতীয় বিতর্কের সূত্রপাত। অভিযোগ ওঠে, ওই চিঠিতে একাধিক বিধায়কের সইয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। কয়েকজন বিধায়ক দাবি করেন, তাঁরা এমন কোনও চিঠিতে স্বাক্ষরই করেননি। এমনকি কারও কারও নাম ব্লক লেটারে লেখা ছিল।

যেহেতু দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওই চিঠিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষর ছিল, তাই তদন্তের স্বার্থে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় সিআইডি। এর আগে তাঁর বাড়িতে গিয়ে নোটিসও দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, এই মামলার তদন্তে নেমে ইতিপূর্বেই তৃণমূলের তিন বিধায়কের হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহ করেছে সিআইডি।

আইনজীবী বদল ও রাজনৈতিক জল্পনা

হাই কোর্টে শুনানির ঠিক আগেই এই মামলা থেকে নাটকীয়ভাবে সরে দাঁড়ান অভিষেকের আইনজীবী তথা তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু মামলাই ছাড়েননি, বরং প্রকাশ্যে অভিষেকের ‘ঔদ্ধত্যের’ বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ জানান, অভিষেক থাকলে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকতে পারবেন না। দলনেত্রীকে তাঁর এবং অভিষেকের মধ্যে থেকে যে কোনও একজনকে বেছে নিতে হবে। এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতের আবহে দলের ভবিষ্যৎ সমীকরণ কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

ভবানী ভবনে নজিরবিহীন নিরাপত্তা

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাজিরাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই ভবানী ভবন চত্বরে নিরাপত্তা চরমে তোলা হয়। কোনওরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা বিশৃঙ্খলা এড়াতে মোতায়েন করা হয়েছিল অতিরিক্ত পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং র‌্যাফ (RAF)। প্রস্তুত রাখা হয়েছিল কাঁদানে গ্যাসের গাড়িও। তবে কড়া নিরাপত্তার ঘেরাটোপে এদিন শান্তিপূর্ণভাবেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.