রাজ্য প্রশাসনের এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে ভেঙে দেওয়া হলো কলকাতা পুরসভার (KMC) পুরবোর্ড। এর ফলে ‘ছোট লালবাড়ি’র নিয়ন্ত্রণও হাতছাড়া হলো তৃণমূল কংগ্রেসের। সোমবার রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করে কলকাতা পুরসভায় প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। পুরসভার বর্তমান কমিশনার স্মিতা পাণ্ডেকেই এই নতুন প্রশাসনিক প্রধান বা প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিগত শাসকদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণেই শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন রাজ্য সরকার এই কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
যে কারণে ভেঙে দেওয়া হলো পুরবোর্ড
গত শুক্রবার কলকাতার মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দেন ফিরহাদ হাকিম। তাঁর পদত্যাগের পরপরই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের তরফে একটি নোটিস জারি করা হয়েছিল। ওই নোটিসে জানতে চাওয়া হয়েছিল, মেয়রের ইস্তফার পর কেন কলকাতা পুরবোর্ড ভেঙে দেওয়া হবে না? একই সঙ্গে নতুন মেয়রের নাম চূড়ান্ত করে সোমবারের মধ্যে তা সরকারকে জানাতে বলা হয়েছিল।
কিন্তু তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও পুরসভার পক্ষ থেকে নতুন কোনো মেয়রের নাম জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। মেয়রের অনুপস্থিতিতে পুরসভার স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হওয়া এবং নাগরিক পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় ১৯৮০ সালের কলকাতা পুরসভা আইনের ১১৭(১) ধারা অনুযায়ী সোমবার এই পুরবোর্ড ভেঙে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
আইনি ধারা: ১৯৮০ সালের কলকাতা পুরসভা আইনের ১১৭(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো পুরসভা যদি তার দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়, ধারাবাহিক কর্তব্যহীনতা বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তবে রাজ্য সরকার তাকে ব্যর্থ ঘোষণা করে ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট ও বাতিল বৈঠক
খাতায়-কলমে কলকাতা পুরসভায় তৃণমূলের ১৩৬ জন কাউন্সিলর থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে দলের অন্দরে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একাধিক কাউন্সিলর প্রকাশ্যে দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন এবং কেউ কেউ বরো চেয়ারম্যানের পদও ত্যাগ করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন অভিযোগে ইতিমধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন পুরসভার ৮ জন তৃণমূল কাউন্সিলর।
এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী মেয়র কে হবেন, তা স্থির করতে রবিবার বিকেলে তৃণমূল ভবনে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতার কাউন্সিলরদের নিয়ে একটি বৈঠক ডাকার কথা ছিল। কিন্তু কতজন কাউন্সিলর শেষ পর্যন্ত বৈঠকে যোগ দেবেন, তা নিয়ে দলের অন্দরেই সংশয় তৈরি হয়। শেষ মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লি যাত্রার কারণ দেখিয়ে বৈঠকটি বাতিল করে দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কাউন্সিলরদের একাংশের ‘বেসুরো’ অবস্থানের কারণেই মূলত বৈঠকটি এড়ানো হয়েছিল।
বাতিল হলো ১৯ জুনের পুর অধিবেশন
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার্যত পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডের হাতে চলে গিয়েছিল। তৃণমূলের একাধিক কাউন্সিলর ‘স্বাধীনভাবে’ কাজ করতে না পারার অভিযোগ তুলছিলেন, যার জেরে ফিরহাদ হাকিমও ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।
এদিকে পুরবোর্ড ভেঙে যাওয়ার কারণে আগামী ১৯ জুন পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায়ের ডাকা পূর্বনির্ধারিত পুর অধিবেশনটিও আইনত বাতিল হয়ে গেছে। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত স্মিতা পাণ্ডেই প্রশাসক হিসেবে কলকাতার পুর-পরিষেবা দেখভাল করবেন।

