মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুর জেলায় এক অভূতপূর্ব ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। পুলিশ যাকে ‘খুন’ করা হয়েছে বলে ধরে নিয়ে তাঁর বাবা ও ভাইকে গ্রেফতার করেছিল, সেই ২৬ বছর বয়সি ‘মৃত’ তরুণী শিবানী কালমেকার নিজেই সশরীরে থানায় হাজির হলেন। নিজের বেঁচে থাকার প্রমাণ দিয়ে নির্দোষ বাবা ও ভাইকে পুলিশি হেফাজত থেকে মুক্ত করলেন তিনি। এই ঘটনায় মহারাষ্ট্র পুলিশের অপেশাদারি তদন্ত ও গাফিলতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত: দুই পরিবারের নিখোঁজ ডায়েরি
বুরহানপুরের খকনার থানা এলাকার কালমেকার গ্রামের বাসিন্দা শিবানী কালমেকার গত এপ্রিল মাস থেকে নিখোঁজ ছিলেন। বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ করেও তাঁর সন্ধান না পেয়ে অবশেষে খকনার থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন পরিবারের সদস্যেরা।
খকনার থানার ইন-চার্জ অভিষেক যাদব জানিয়েছেন, শিবানী নিখোঁজ হওয়ার ঠিক সমসাময়িক সময়ে ওই গ্রামেরই অরুণ কালমেকার নামের এক যুবকও নিখোঁজ হন। অরুণের পরিবারও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। দুই তরুণ-তরুণীর সন্ধানে যৌথভাবে তল্লাশি শুরু করে মধ্যপ্রদেশ পুলিশ।
অর্ধদগ্ধ দেহ উদ্ধার ও তদন্তের ভুল মোড়
তদন্ত চলাকালীন মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুর লাগোয়া মহারাষ্ট্রের বুলদাণা জেলার রাজুরা বাঁধের কাছ থেকে এক তরুণীর মুণ্ডহীন ও অর্ধদগ্ধ দেহ উদ্ধার করে মহারাষ্ট্র পুলিশ। এই ঘটনার পরই তদন্ত সম্পূর্ণ ভুল দিকে মোড় নেয়।
মহারাষ্ট্রের বুলদাণা পুলিশ কোনো প্রকার বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা ছাড়াই দাবি করে যে, উদ্ধার হওয়া ওই বিকৃত দেহটি নিখোঁজ শিবানী কালমেকারের। এরপরই ‘অনার কিলিং’ বা পারিবারিক সম্মানের খাতিরে খুনের অভিযোগে শিবানীর বাবা বাপুরাম কালমেকার এবং ভাই অজয় কালমেকারকে গ্রেফতার করে মহারাষ্ট্র পুলিশ।
সশরীরে থানায় হাজির ‘মৃত’ তরুণী
এদিকে, মধ্যপ্রদেশ পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে শিবানী এবং নিখোঁজ অরুণকে সুস্থ অবস্থায় খুঁজে পায়। জানা যায়, তাঁরা দুজনে একসঙ্গেই স্বেচ্ছায় গ্রাম ছেড়েছিলেন। কাজের সূত্রে অরুণ মহারাষ্ট্রের নাসিকে চলে যান এবং শিবানীও তাঁর সঙ্গেই সেখানে বসবাস করছিলেন।
নিজেদের হেফাজতে থাকা শিবানী যখন জানতে পারেন যে তাঁকে খুনের মিথ্যা অভিযোগে তাঁর বাবা ও ভাইকে মহারাষ্ট্র পুলিশ গ্রেফতার করেছে, তখন তিনি তড়িঘড়ি নিজেই থানায় হাজির হন। বৃহস্পতিবার পুলিশ সশরীরে উপস্থিত শিবানীর বয়ান রেকর্ড করে এবং তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ধৃত বাপুরাম ও অজয় কালমেকারকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হয়।
কাঠগড়ায় মহারাষ্ট্র পুলিশ: ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়াই কেন গ্রেফতার?
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই মহারাষ্ট্র পুলিশের ভূমিকা ও কার্যপদ্ধতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া হয়েছে। আইন ও নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে, কেন উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় ওই অর্ধদগ্ধ দেহের কোনো ডিএনএ (DNA) পরীক্ষা করা হলো না, তা নিয়ে সরব হয়েছেন আইনজ্ঞরা।
কেবল অনুমানের ভিত্তিতে একটি মুণ্ডহীন দেহকে শিবানীর বলে দেগে দেওয়া এবং একটি পরিবারকে খুনের মিথ্যা মামলায় হেনস্থা করার জেরে বুরহানপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। উদ্ধার হওয়া আসল মৃতদেহটি কার, তা জানতে এখন নতুন করে তদন্ত শুরু করতে হচ্ছে পুলিশকে।

