ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় ১১টা। উত্তর ২৪ পরগনার অন্যতম প্রান্তিক জনপদ স্বরূপনগরের রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ শুনশান। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে এগিয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা রাস্তায় তীব্র গতিতে ছুটছে গাড়ি। তবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে মাত্র এক-দেড় কিলোমিটার দূরে হাকিমপুর বিএসএফ চেকপোস্টের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। রাস্তার ধারে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পুলিশের গাড়ি, কনস্টেবল এবং সিভিক ভলান্টিয়ারদের ছোট-বড় জটলা। সেই সঙ্গে চলছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের কঠোর টহলদারি।
সীমান্তে মোতায়েন এক সাব-ইন্সপেক্টর জানালেন, পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে খোদ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ASP) পার্থ ঘোষ এবং এসডিপিও (SDPO) আয়ুষ পাণ্ডে সেখানে উপস্থিত রয়েছেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ব্যস্ত পায়ে বিএসএফ চৌকির দিকে যাওয়া এবং ফিরে আসার প্রক্রিয়া চলছে নিরন্তর। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হাকিমপুর সীমান্তের এই ছবি পূর্বতন জমানার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে বিএসএফ ও রাজ্য পুলিশ
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে যখন হাকিমপুর সীমান্তে অনুপ্রবেশকারীদের স্বদেশে ফেরার ঢল নেমেছিল, তখন সেখানে রাজ্য পুলিশের এমন তৎপরতা চোখে পড়েনি। তৎকালীন এসআইআর (SIR) আবহের মধ্যে ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার জন্য চেকপোস্টের বাইরে অনুপ্রবেশকারীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) হিমশিম খেলেও, তৎকালীন শাসকদলের অধীনস্থ রাজ্য পুলিশের কোনো দেখা মেলেনি। তবে রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদলের পর এখন বিএসএফ এবং রাজ্য পুলিশ সম্পূর্ণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথভাবে সীমান্ত পাহারা ও অনুপ্রবেশকারীদের সনাক্তকরণের কাজ করছে।
বদলে গেছে পদ্ধতি: সরাসরি সীমান্তের বদলে ‘হোল্ডিং সেন্টার’
গত ছয় মাসের মধ্যে অনুপ্রবেশকারীদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর পদ্ধতিতে বড়সড় বদল এনেছে বর্তমান রাজ্য সরকার। আগে অনুপ্রবেশকারীদের নথিপত্র পরীক্ষা করে বিএসএফ সরাসরি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB)-এর হাতে তুলে দিত। কিন্তু বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হলেই তাঁদের সরাসরি সীমান্তে না পাঠিয়ে প্রথমে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটক শিবিরে পাঠানো হচ্ছে।
হাকিমপুর চেকপোস্টে নাম নথিভুক্ত করার সময় অনেক অনুপ্রবেশকারীর মনেই গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তবে ভিড়ের মধ্য থেকেই আশ্বাসের সুর শোনা যাচ্ছে:
“গ্রেফতার করবে কেন? মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তো স্পষ্ট বলেছেন, যারা নিজেদের দেশে চলে যেতে চায়, তাদের কাউকে আটকানো হবে না। নিরাপদে চলে যেতে দেওয়া হবে।”
বর্তমানে বিএসএফ-এর পাশাপাশি রাজ্য পুলিশও অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশি নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করছে। এরপর ১০০ থেকে ১৫০ জনের দল তৈরি করে পুলিশের বাসে করে তাঁদের নির্দিষ্ট হোল্ডিং সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করছে স্থানীয় প্রশাসন। বাংলাদেশ থেকে বিএসএফ-এর কাছে সবুজ সংকেত আসার পর, পুলিশ তাঁদের পুনরায় সীমান্তে এনে বিএসএফ-এর মাধ্যমে বিজিবির হাতে তুলে দিচ্ছে।
স্বরূপনগরে ৩টি অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টার, সক্রিয় প্রশাসন
অনুপ্রবেশকারীদের রাখার জন্য স্বরূপনগরে আপাতত তিনটি অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টার চালু করা হয়েছে:
- তেঁতুলিয়া ‘পথের সাথী’ অতিথিশালা: তৃণমূল জমানায় পর্যটকদের জন্য নির্মিত এই অতিথিশালায় বুধবার পর্যন্ত ১১৬ জন অনুপ্রবেশকারী ছিলেন। তাঁদের খাবারের দায়িত্ব সামলাচ্ছে স্থানীয় বিডিও অফিস।
- চারঘাট হাইস্কুল সংলগ্ন ফ্লাড শেল্টার: এখানে ৬৩ জন আটক রয়েছেন।
- মেদিয়ার একটি স্কুল: এখানে আপাতত ৫২ জন রয়েছেন।
চারঘাট ও মেদিয়ার স্কুলে আটক থাকা অনুপ্রবেশকারীদের জন্য রান্নার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্কুলেরই মিড-ডে মিল কর্মীদের। এই জরুরি পরিস্থিতির কারণে তাঁদের গরমের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। স্বরূপনগর বিডিও অফিস থেকে নিয়মিত শুকনো জলখাবার পাঠানো হচ্ছে। প্রতিটি সেন্টারে কড়া পুলিশি পাহারার পাশাপাশি আশা (ASHA) কর্মীরা এবং স্থানীয় মেডিক্যাল অফিসার সৌরভ আচার্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দেখভাল করছেন।
বুধবার দুপুরে চারঘাট হাইস্কুলে আরও ৭০ জন অনুপ্রবেশকারীকে নিয়ে আসার খবর আসতেই প্রশাসনিক তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পায়। চারঘাট গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজেপি সদস্য রাজেশ মণ্ডল এবং বিজেপি সমর্থিত নির্দল সদস্য মানস বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মঙ্গলবার রাতে বিডিও-র নির্দেশ পাওয়ার পর মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে তাঁরা এই সমস্ত আবাসন ও পরিচ্ছন্নতার বন্দোবস্ত সুনিশ্চিত করেছেন।
‘বুলডোজ়ারের ভয়’ ও বাড়িওয়ালাদের চাপ
ছয় মাস আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মূল ফারাক হলো মনস্তত্ত্বে। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনুপ্রবেশকারীরা এসআইআর-এর ভয়ে মূলত স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ ফিরছিলেন। কিন্তু এবার যাঁরা ফিরছেন, তাঁদের অধিকাংশেরই দাবি— তাঁরা বাধ্য হয়ে ফিরছেন।
নিউটাউনের ঘুনি বস্তি, এয়ারপোর্টের কাছাকাছি বাঁকড়া, হাওড়ার বস্তি কিংবা দক্ষিণ ২৪ পরগনার দক্ষিণ বারাসত থেকে আসা সীমান্তমুখী পরিবারগুলির মুখে এখন একটাই আতঙ্ক। তাঁদের বক্তব্য:
“যাদের বাড়িতে আমরা ভাড়া থাকতাম, তারা আর আমাদের রাখছে না। বাড়িওয়ালারা স্পষ্ট বলে দিয়েছে, ‘তোমরা থাকলে আমাদের বিপদ হবে। পুলিশ এসে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে এবং আমাদের বাড়ি বুলডোজ়ার দিয়ে ভেঙে দেবে। তোমরা এখনই চলে যাও’।”
ঘুনি বস্তি থেকে আসা মফিজুল মোল্লা জানান, সরকার বদলের পর থেকেই এলাকায় ঘন ঘন পুলিশি তল্লাশি শুরু হয়েছে। আইনি ও প্রশাসনিক ভীতি এতটাই জাঁকিয়ে বসেছে যে, বাড়িওয়ালাদের চাপে এবং গ্রেফতারির ভয়ে তাঁরা তড়িঘড়ি সীমান্তমুখী হয়েছেন।
সীমান্ত এলাকা থেকে উধাও তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ
হাকিমপুর সীমান্তের আরও একটি বড় পরিবর্তন হলো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অবসান। গত নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সীমান্ত এলাকার পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের হাতে। অনুপ্রবেশকারীদের থাকা, খাওয়া, ছাউনির ব্যবস্থা থেকে শুরু করে তাঁরা সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলবেন কি না— সবটাই নিয়ন্ত্রণ করতেন তাঁরা। এমনকি সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছিল।
তবে বর্তমানে সেই চেনা ছবি সম্পূর্ণ উধাও। স্থানীয় পঞ্চায়েতের বোর্ড ও প্রধান-উপপ্রধানেরা খাতায়-কলমে একই থাকলেও, হাকিমপুর চেকপোস্টের ত্রিসীমানায় এখন আর কোনো তৃণমূল নেতার দেখা মিলছে না। রাজনৈতিক চোখরাঙানি ও শাসানি অতীত হয়ে গিয়ে, সম্পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে স্বাভাবিক ও শান্ত থমথমে মেজাজে চলছে সীমান্ত সুরক্ষার কাজ। শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলেই হাকিমপুর সীমান্তের চেনা সমীকরণ আজ আমূল বদলে গিয়েছে।

