বলিউডের চিরসবুজ ও বর্ণময় অভিনেতাদের তালিকা তৈরি করলে বিনোদ খন্নার নাম ওপরের দিকেই থাকবে। সমসাময়িক বাকি তারকাদের তুলনায় তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, সুঠাম চেহারা এবং দরাজ মনের বিনোদ খন্নাকে অনেকেই বলিউডের আগামী ‘সুপারস্টার’ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু কেরিয়ারের মধ্যগগনে থাকা অবস্থাতেই আধ্যাত্মিক গুরু রজনীশ ওরফে ওশোর সংস্পর্শে এসে বদলে যায় তাঁর জীবনের গতিপথ। স্ত্রী গীতাঞ্জলি এবং দুই সন্তান রাহুল ও অক্ষয়কে ছেড়ে তিনি পাড়ি দেন সুদূর আমেরিকায়।
মহেশ ভাটের হাত ধরে ওশোর আশ্রমে প্রবেশ
বিনোদ খন্নার ওশোর দর্শনে দীক্ষিত হওয়ার নেপথ্যে ছিলেন বিশিষ্ট পরিচালক মহেশ ভাট। সেই সময়ে মহেশ ভাটের প্রথম সন্তান পূজার জন্ম হয়ে গিয়েছে এবং পরিচালক হিসেবে তাঁর কেরিয়ারও তখন টলমল। আর্থিক ও মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাওয়া মহেশ প্রায়শই পুনের ওশো আশ্রমে যাতায়াত করতেন। অন্যদিকে, সেই একই সময়ে মা এবং কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে হারিয়ে চরম মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বিনোদ খন্না। জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজতে মহেশ ভাটের মাধ্যমেই ওশোর আশ্রমে পা রাখেন এই অভিনেতা।
কেরিয়ারের শীর্ষে থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ
‘দ্য বার্নিং ট্রেন’ ছবির বিপুল সাফল্যের পর যখন বিনোদ খন্নার কাছে একের পর এক বড় ছবির প্রস্তাব আসছিল, ঠিক তখনই তাঁর মধ্যে এক আধ্যাত্মিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ পোশাক ছেড়ে তিনি জোব্বা পরা শুরু করেন, গলায় স্থান পায় রুদ্রাক্ষের মালা এবং কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরেও তিনি ওশোর বাণী আওড়াতে শুরু করেন।
একটা সময় ওশোর মতাদর্শে এতটাই আবিষ্ট হয়ে পড়েন যে, ওশো যখন পুনের আশ্রম গুটিয়ে আমেরিকায় পাড়ি দেন, বিনোদও তখন বলিউডকে বিদায় জানিয়ে তাঁর অনুগামী হন। সেখানে গিয়ে গ্ল্যামার দুনিয়ার এই সুপারস্টার শৌচালয় পরিষ্কার করা, বাগানে ঝাড়ু দেওয়া এবং গাছে জল দেওয়ার মতো সাধারণ কাজ বেছে নেন। বছরের পর বছর পরিবারের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে দেন তিনি।
ভাঙন সংসারে, চূড়ান্ত পরিণতি বিবাহবিচ্ছেদ
স্বামীকে সংসারে ফিরিয়ে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তাঁর প্রথম স্ত্রী গীতাঞ্জলি। কিন্তু বিনোদ নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। অবশেষে গীতাঞ্জলি তাঁকে সংসার অথবা আশ্রমের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা দিলে, বিনোদ আশ্রম জীবনকেই বেছে নেন। ফলস্বরূপ, ১৯৮৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
বলিউডে প্রত্যাবর্তন ও রাজনীতির ময়দান
দীর্ঘদিন পর, ১৯৮৭ সালে ভারতে ফিরে আসেন বিনোদ খন্না। তবে ততদিনে বলিউডের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। অমিতাভ বচ্চন ততদিনে ইন্ডাস্ট্রির একচ্ছত্র ‘সুপারস্টার’ এবং বাজারে চলে এসেছেন একাধিক নতুন অভিনেতা ও স্টারকিড। ফলে বিনোদ খন্নার অভিনয়ে কামব্যাক বা প্রত্যাবর্তন আর আগের মতো সফল হয়নি।
রাজনৈতিক কেরিয়ার: রুপোলি পর্দার মোহ কাটিয়ে এরপর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) টিকিটে পঞ্জাবের গুরদাসপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। ১৯৯৮ থেকে ২০০৯ এবং পরবর্তীতে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল (তাঁর মৃত্যুর বছর) পর্যন্ত তিনি গুরদাসপুরের সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বলিউডের শীর্ষ আসন ছেড়ে আমেরিকার আশ্রমে শৌচালয় পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে দেশের সংসদ ভবন— বিনোদ খন্নার এই জীবনকাহিনি আজও যেকোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকে হার মানায়।

