সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড়সড় সংস্কারের পথে নতুন সরকার, বিধানসভায় আসছে নতুন বিল: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড়সড় সংস্কারের পথে নতুন সরকার, বিধানসভায় আসছে নতুন বিল: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

তৃণমূল জমানার অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায় ‘নিয়োগ দুর্নীতি’র ছায়া কাটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও কলঙ্কযুক্ত করতে একগুচ্ছ বড়সড় সংস্কারের ইঙ্গিত দিলেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার শিয়ালদহে আয়োজিত ‘রোজগার মেলা’য় অংশ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, বিগত সরকারের আমলে খাদে তলিয়ে যাওয়া নিয়োগ প্রক্রিয়াকে টেনে তোলাই এখন তাঁর সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এই স্বচ্ছতা ফেরাতে আগামী বিধানসভা অধিবেশনেই নতুন নিয়োগ বিল বা আইন আনা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে পুরসভার নিয়োগ পর্যন্ত যে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে, তার জেরে সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টের হস্তক্ষেপে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছে। এর ফলে জাতীয় স্তরে রাজ্যের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে রাজ্য সরকার ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত সংস্থাগুলির নিয়োগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

পরীক্ষা পদ্ধতিতে যে যে বদল আসতে চলেছে:

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দুর্নীতি রুখতে মূলত পরীক্ষা পদ্ধতির আধুনিকীকরণ ও নম্বর বিভাজনের ওপর জোর দিয়েছেন:

  • মৌখিক পরীক্ষার নম্বর হ্রাস: বিগত সরকারের আমলে ইন্টারভিউ বা মৌখিক পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর রেখে দুর্নীতির রাস্তা খোলা হয়েছিল বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। নতুন নিয়মে মৌখিকের নম্বর কমিয়ে লিখিত পরীক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
  • ওএমআর শিটের কার্বন কপি: স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পরীক্ষার্থীদের ওএমআর শিটের (OMR Sheet) কার্বন কপি সরাসরি তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
  • লিখিত ও অ্যাকাডেমিক মূল্যায়নে জোর: মেধার ভিত্তিতে সঠিক মূল্যায়নের জন্য লিখিত পরীক্ষা ও অ্যাকাডেমিক স্কোরের ওপর মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকবে।

মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন মহলে:

মুখ্যমন্ত্রীর এই সংস্কারের ডাককে বিভিন্ন মহল ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে চাইছে সবাই।

আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য: নিয়োগ দুর্নীতি মামলার অন্যতম প্রধান আইনজীবী তথা প্রাক্তন সিপিএম সাংসদ বিকাশ ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “নিয়োগ প্রক্রিয়া যাতে স্বচ্ছ হয়, তার জন্যই আমাদের দীর্ঘ লড়াই। নতুন সরকার যদি সেটা করতে পারে, তবে অবশ্যই স্বাগত। তবে শুধু মুখে বললে হবে না, বাস্তবে তা কার্যকর করে দেখাতে হবে।”

শিক্ষাবিদ প্রশান্ত রায়: প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন প্রধান প্রশান্ত রায়ের মতে, “দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের কারণেই পূর্বতন সরকারের পতন ও বর্তমান সরকারের জয় হয়েছে। তাই নতুন সরকার এই দুর্নীতি উপড়ে ফেলতে কাজ করবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে তারা বাস্তবে কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার।”

প্রশ্ন তুলছেন চাকরিহারা ‘যোগ্য’ শিক্ষকেরা:

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ‘নতুন কিছু নয়’ বলে উল্লেখ করেছেন নিয়োগ দুর্নীতির জেরে চাকরি হারানো ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের প্রতিনিধি চিন্ময় মণ্ডল। তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০২৫ সালের এসএসসি (SSC) পরীক্ষায় ইতিমধ্যেই ওএমআর শিটের কার্বন কপি দেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছিল।

তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “শুধুমাত্র ইন্টারভিউয়ের নম্বর কমালেই কি স্বজনপোষণ বন্ধ হবে? প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও নজরদারি না থাকলে দুর্নীতি রোখা অসম্ভব। অতীতে পরীক্ষার পর পুরো সিস্টেমের ভেতরে কারচুপি করা হয়েছে। তাই অফিসারদের ওপর নজরদারি ও গোটা সিস্টেমের বদল দরকার।” এর পাশাপাশি যোগ্য চাকরিহারারা তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছেন।

বিরোধী তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া:

এদিকে রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েও পাল্টা খোঁচা দিতে ছাড়েনি বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, “শুভেন্দু অধিকারীর এই চিন্তাভাবনাকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে আমাদের প্রশ্ন, ইন্টারভিউয়ের নম্বর কমানো বা কার্বন কপি দেওয়ার কথা বলে তিনি কি পরোক্ষভাবে জাতীয় স্তরের ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষা বা মধ্যপ্রদেশের ‘ব্যাপম’ (Vyapam) কেলেঙ্কারির দুর্নীতির দিকেও আঙুল তুললেন? সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধেই যদি তিনি এভাবে সরব হন, তবে খুবই ভালো।”

রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধানসভার আগামী অধিবেশনে এই নতুন নিয়োগ বিল পাশ করানো এবং তা নিখুঁতভাবে রূপায়ণ করাই এখন নতুন সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.