ফুটবল মহলে একটি প্রচলিত কথা রয়েছে— ‘রেফারির শেষ বাঁশি বাজার আগে উল্লাস করতে নেই।’ রবিবাসরীয় যুবভারতীতে মরসুমের শেষ কলকাতা ডার্বিতে ঠিক এই ভুলেরই খেসারত দিতে হলো ইস্টবেঙ্গল এফসি-কে। ম্যাচের ৮৪ মিনিটে এডমুন্ড লালরিন্ডিকার গোলে লাল-হলুদ শিবির যখন উৎসবে মেতে ওঠে, তখন মনে হচ্ছিল লিগ খতমে আর কোনো বাধা নেই। কিন্তু সেই অতি-উল্লাসের চড়া মাশুল দিতে হলো মনঃসংযোগ হারিয়ে। ম্যাচের একেবারে অন্তিমলগ্নে (৯০ মিনিটে) জেসন কামিংসের পেনাল্টি-বক্সের ম্যাজিকে সমতা ফেরাল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের অমীমাংসিত ফলাফলেই শেষ হলো মেগা ডার্বি।
এই ড্রয়ের ফলে লিগ টেবিলের যা পরিস্থিতি, তাতে মোহনবাগানের তুলনায় অনেকটাই সুবিধাজনক স্থানে রইল ইস্টবেঙ্গল। আগামী ২১ মে লিগের শেষ ম্যাচে ইন্টার কাশীকে হারালেই প্রথম বারের জন্য আইএসএল (ISL) চ্যাম্পিয়ন হবে লাল-হলুদ ব্রিগেড। অন্য দিকে, মোহনবাগানের ভাগ্য এখন আর নিজেদের হাতে নেই। শেষ ম্যাচে স্পোর্টিং দিল্লিকে বড় ব্যবধানে হারানোর পাশাপাশি তাদের চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হবে ইস্টবেঙ্গল বনাম কাশী ম্যাচের দিকে। ইস্টবেঙ্গল পয়েন্ট নষ্ট করলেই কেবল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ আসবে সবুজ-মেরুনের সামনে।
প্রথমার্ধে সহজ সুযোগ নষ্টের খতিয়ান
এদিন ম্যাচ শুরুর আগে মোহনবাগানের প্রয়াত প্রাক্তন সভাপতি স্বপনসাধন (টুটু) বসুর স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন দু’দলের ফুটবলাররা। যুবভারতীর ভরা গ্যালারির ৬২,২০১ দর্শকের গগনভেদী চিৎকারের মধ্যে ম্যাচের শুরু থেকেই অল-আউট আক্রমণে ঝাঁঝ বাড়ায় মোহনবাগান। লিস্টন কোলাসোর নিখুঁত ক্রস থেকে টম অলড্রেডের হেড বারের ওপর দিয়ে চলে যায়। এর কিছুক্ষণ পরেই শুভাশিস বসুর পাস থেকে বক্সের মধ্যে বল পেয়েও শট নিতে দেরি করে ফেলেন সাহাল আব্দুল সামাদ।
মোহনবাগানের প্রাথমিক ঝাপটা সামলে মাঝমাঠে পিভি বিষ্ণুর গতিকে কাজে লাগিয়ে কাউন্টার-অ্যাটাকে ফেরে ইস্টবেঙ্গল। ১৫ মিনিটের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে অ্যান্টন সোজবার্গের বাঁ পায়ের জোরালো শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে দুর্ভাগ্য সঙ্গী হয় লাল-হলুদের। এরপর জিকসন সিংহের থ্রু বল ধরে মোহনবাগান গোলরক্ষক বিশাল কাইথকে একা পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হন বিপিন সিংহ। বেশি ড্রিবল করতে গিয়ে ডিফেন্ডারের গায়ে বল মেরে বসেন তিনি। ৩৭ মিনিটে মিগুয়েলের পাস থেকে সোজবার্গও বল সরাসরি বিশালের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিত গোল নষ্ট করেন। ওদিকে মোহনবাগানের অনিরুদ্ধ থাপার দূরপাল্লার শট দারুণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন ইস্টবেঙ্গল কিপার প্রভসুখন সিংহ গিল। প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্যভাবেই।
লোবেরার স্ট্র্যাটেজি বনাম অস্কারের চাল
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই শুভাশিস বসুর ডিফেন্সিভ ভুলের সুযোগ নিয়ে বক্সের মধ্যে বল পেয়ে যান বিপিন সিংহ, কিন্তু তাঁর শট বারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। লাল-হলুদ কোচ অস্কার ব্রুজো আক্রমণাত্মক নীতি নিয়ে মাঠে নামান লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা ইউসেফ এজেজারিকে। এর ফলে ৬৬ মিনিটে পর পর সুযোগ পায় ইস্টবেঙ্গল। মিগুয়েলের শট বিশাল বাঁচানোর পর ফিরতি বলে এজেজারির শট গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করেন অলড্রেড।
অন্যদিকে, জেমস ম্যাকলারেন ও সাহালদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব স্পষ্ট হওয়ায় সাহালকে তুলে দিমিত্রি পেত্রাতোস এবং মাঝমাঠে গতি আনতে রবসন রবিনহোকে নামান বাগান কোচ সের্জিয়ো লোবেরা। ৭৮ মিনিটে বক্সের মধ্যে কেভিন সিবিলের চ্যালেঞ্জে ম্যাকলারেন পড়ে গেলে পেনাল্টি পেতে পারত মোহনবাগান, কিন্তু রেফারি ফাউল এড়িয়ে যাওয়ায় সে যাত্রা বেঁচে যায় ইস্টবেঙ্গল। গোল পেতে মরিয়া লোবেরা এরপর মাঠে নামান তাঁর ট্রাম্প কার্ড জেসন কামিংসকে।
শেষ ৬ মিনিটের নাটক: এডমুন্ডের গোল ও কামিংসের জবাব
ম্যাচের ৮৪ মিনিটে ডেডলক খোলে ইস্টবেঙ্গল। এজেজারির থেকে বল পেয়ে মিগুয়েলের পাস বাড়িয়ে দেন বক্সে ওত পেতে থাকা এডমুন্ড লালরিন্ডিকাকে। ডিফেন্ডারকে গায়ের জোরে পরাস্ত করে আগুয়ান কিপার বিশাল কাইথের ডান দিক দিয়ে নিখুঁত ফিনিশে বল জালে জড়ান এডমুন্ড (১-০)।
এই গোলের পর মাঠের কোণে লাল-হলুদ ফুটবলার ও ডাগআউটের দীর্ঘ উল্লাসে কিছুটা হলেও মনঃসংযোগের খামতি তৈরি হয় দলের রক্ষণে। আর সেই সুযোগটাই নেয় লড়াকু মোহনবাগান। ৯০ মিনিটের মাথায় রবসনের মাপা কর্নার থেকে দুর্দান্ত ব্যাক-হেডে প্রভসুখন গিলকে পরাস্ত করে গোল করেন জেসন কামিংস (১-১)। সমতা ফিরে আসতেই গ্যালারিতে সবুজ-মেরুন সমর্থকদের উল্লাস আছড়ে পড়ে।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়েও দুই দলই গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল। বিপিনের পাস অল্পের জন্য মিস করেন এজেজারি, অন্যদিকে শেষ মিনিটে গোলের মুখ থেকে ম্যাকলারেনের শট অবিশ্বাস্যভাবে রুখে দেন প্রভসুখন। খেলা শেষ হয় ১-১ স্কোরেই। ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ার সময় ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের শরীরী ভাষায় আত্মবিশ্বাস বেশি চোখে পড়ে, কারণ ট্রফি জয়ের চাবিকাঠি এখনও তাঁদের পকেটেই। অন্যদিকে নিজেদের ঘরের মাঠে পয়েন্ট নষ্ট করে মাঠ ছাড়ার সময় পেত্রাতোস-কামিংসদের মুখে হতাশার ছাপ ছিল স্পষ্ট।

