পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতার অলিন্দে এখন পরিবর্তনের হাওয়া। ২০০-র বেশি আসন নিয়ে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে এক নয়া সমীকরণ। এই আবহে দলবদলের প্রবল স্রোত দেখা দিলেও, আপাতত নিজেদের দরজা ‘সিল’ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল বিজেপি নেতৃত্ব। সংগঠনের সব স্তরে জরুরি বার্তা পাঠিয়ে অন্য দল থেকে নেতা-কর্মীদের যোগদানের ওপর সরাসরি ‘নিষেধাজ্ঞা’ জারি করেছে পদ্ম শিবির।
তৃণমূলের অন্দরে ফাটল? বিজেপির দাবি বনাম মমতার পাল্টা চাল
ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। বিজেপি শিবিরের দাবি, দ্বিতীয় দফার ভোট মিটে যাওয়ার পর থেকেই তৃণমূলের নিচুতলার নেতা, পঞ্চায়েত সদস্য এবং কাউন্সিলরদের ফোন আসতে শুরু করেছিল। লক্ষ্য একটাই— ফলাফল প্রতিকূলে গেলে যাতে বিজেপির দরজা তাঁদের জন্য খোলা থাকে।
বিজেপি নেতৃত্বের মতে, তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব ২০০ আসনে জয়ের যে দাবি করেছিল, তা আসলে কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার ‘শেষ চেষ্টা’ ছিল। কিন্তু ফলাফল উল্টো হতেই এখন বহু তৃণমূল নেতা গেরুয়া শিবিরে নাম লেখাতে মরিয়া।
কেন এই ‘নিষেধাজ্ঞা’? বেনোজল রুখতে মরিয়া বিজেপি
বিজেপি নেতৃত্বের আশঙ্কা, যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বা ক্ষোভ উগরে দিয়ে মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, তাঁরাই যদি রাতারাতি দলে ঢুকে ‘মাতব্বর’ হয়ে বসেন, তবে জনমানসে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।
- শমীক ভট্টাচার্য (রাজ্য বিজেপি সভাপতি): “যোগদান করানো একদম বন্ধ! অন্য কোনও দল থেকে আপাতত কাউকে বিজেপিতে নেওয়া যাবে না। সংগঠনের প্রতিটি স্তরে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।”
- সুকান্ত মজুমদার (কেন্দ্রীয় মন্ত্রী): “পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত সব যোগদান বন্ধ। কেউ ভবিষ্যতে যোগ দিতে পারবেন কি না, তা দল পরে স্থির করবে।”
অফিস দখল রুখতেও কড়া হুঁশিয়ারি
সোমবার সন্ধ্যা থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় দখল বা ভাঙচুরের বিক্ষিপ্ত অভিযোগ উঠেছে। এই বিষয়ে কর্মীদের কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, “অন্যের অফিস দখল করে সেখানে বিজেপির পতাকা তোলা যাবে না। এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
বিজেপির বিরুদ্ধে ‘চাপ’ সৃষ্টির পাল্টা অভিযোগ মমতার
অন্য দিকে, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিযোগ এনেছেন। তাঁর দাবি, তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মীকে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জন্য ‘চাপ’ দেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “কেউ যদি নিজের নিরাপত্তার খাতিরে ওপাশে যেতে চান, আমি বাধা দেব না।”
মমতার এই অভিযোগকে অবশ্য আমল দিতে রাজি নয় বিজেপি নেতৃত্ব। তাঁদের পাল্টা দাবি, মানুষ যাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাঁদের রাতারাতি দলে নিয়ে আবার জনতার ওপর অত্যাচার করার সুযোগ তাঁরা দিতে চান না।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: প্রত্যাশার ঝড় বনাম বাস্তব
উল্লেখ্য, গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় রাজ্যে নজিরবিহীন ৯৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল। তৃণমূল একে ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বললেও, ৪ মে ইভিএম খুলতেই দেখা যায় তা আসলে ছিল পরিবর্তনের সুতীব্র হাওয়া। তৃণমূল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হলেও বিজেপি একাই ২০০-র গণ্ডি পার করে দিয়েছে। এই অভাবনীয় জয়ের পর এখন নয়া সরকার গঠনের প্রস্তুতি এবং ঘর সামলানো— এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে বিজেপি।

