ইসলামাবাদে শান্তি বৈঠকের মাঝেই সৌদিতে যুদ্ধবিমান পাঠাল পাকিস্তান: ত্রিমুখী চাপে ইসলামবাদ

ইসলামাবাদে শান্তি বৈঠকের মাঝেই সৌদিতে যুদ্ধবিমান পাঠাল পাকিস্তান: ত্রিমুখী চাপে ইসলামবাদ

একদিকে যখন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে যুযুধান দুই দেশ আমেরিকা ও ইরান শান্তি বৈঠকে বসেছে, ঠিক তখনই সৌদি আরবে যুদ্ধবিমান পাঠাল পাকিস্তান। সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াধের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে শাহবাজ শরিফ সরকার। শনিবার সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের রাজা আবদুল আজিজ বিমানঘাঁটিতে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানগুলো অবতরণ করেছে বলে নিশ্চিত করেছে সে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।


প্রতিরক্ষা চুক্তি ও কৌশলগত অবস্থান

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমনের উপস্থিতিতে হওয়া এই চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল— এক দেশে আক্রমণ হলে অন্য দেশ সেটিকে নিজেদের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য করবে। সেই প্রতিশ্রুতির প্রথম ধাপ হিসেবেই এই যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইরান-আমেরিকা সংকটে পাকিস্তানের ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলার পর ইরান প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার ঘাঁটিগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছিল তেহরান। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

  • মধ্যস্থতা: ইসলামাবাদের উদ্যোগেই শনিবার আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
  • দায়বদ্ধতা: পাক বিদেশমন্ত্রী ইশাক দার জানিয়েছেন, চুক্তির কারণে সৌদির প্রতি পাকিস্তানের নির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা রয়েছে এবং সে বিষয়ে ইরানকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল।
  • আশ্বাস: ইরান দাবি করেছিল, সৌদির মাটি ব্যবহার করে যেন তাদের ওপর হামলা না হয়। পাকিস্তান সেই নিশ্চয়তা দিলেও গত কয়েক মাসে সৌদিতে ইরানি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

বিনিয়োগ ও অর্থনীতির অঙ্ক

পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের নেপথ্যে কেবল সামরিক নয়, বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে রয়েছে। ১. বিনিয়োগ: চুক্তির শর্ত মেনে সৌদি আরব পাকিস্তানে ৫০০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের কথা জানিয়েছে। ২. প্রবাসী শ্রমিক: সৌদি আরবে প্রায় ২৫ লক্ষ পাকিস্তানি কর্মরত রয়েছেন, যাদের পাঠানো অর্থ পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। ৩. উচ্চপর্যায়ের বৈঠক: শনিবারের শান্তি বৈঠকের আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন সৌদির অর্থমন্ত্রী মহম্মদ আল-জাদান।


নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অভিমত

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ইমতিয়াজ গুল আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, “মাত্র তিনটি যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে সৌদি আরবকে বিশাল কোনও সামরিক সাহায্য করা সম্ভব নয়। আসলে এর মাধ্যমে পাকিস্তান রিয়াধকে বার্তা দিতে চাইছে যে তারা চুক্তির কথা ভোলেনি। একইসঙ্গে ইরানকেও একটি কড়া বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।”

তবে অনেক কূটনীতিবিদ মনে করছেন, একদিকে শান্তি বৈঠকের আয়োজন করা এবং অন্যদিকে বিপক্ষ শিবিরে যুদ্ধবিমান পাঠানো পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হতে পারে। আমেরিকা-ইরান বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠছে, সৌদিতে থাকা এই পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানগুলো কি ভবিষ্যতে তেহরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে? পাকিস্তান অবশ্য সামরিক সংঘাত এড়াতে সব রকম কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.