বসন্তের শুরুতে পর্যটকদের আনাগোনায় যখন মুখরিত শৈলশহর, ঠিক তখনই এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাক্ষী থাকল দার্জিলিংয়ের ডালি পুলিশ লাইন। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব যাঁদের কাঁধে, তাঁদের মধ্যেই বেধে গেল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। সামান্য কথা কাটাকাটি থেকে শুরু হওয়া বিবাদ গড়াল গুলিবর্ষণে। অভিযুক্ত এএসআই (ASI) উমেশ ছেত্রীর সার্ভিস রিভলভার থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর জখম হলেন সহকর্মী এএসআই বিনোদ থাপা। জি নিউজ (Zee News) সূত্রে এই খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিবাদের সূত্রপাত ও রণক্ষেত্র ব্যারাক
সূত্রের খবর, শনিবার রাতে ডালি পুলিশ লাইনের ব্যারাকে উমেশ ছেত্রী এবং বিনোদ থাপার মধ্যে কোনও একটি বিষয় নিয়ে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। ঝগড়া চরম পর্যায়ে পৌঁছালে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে উমেশ তাঁর সার্ভিস পিস্তল বের করেন এবং খুব কাছ থেকে বিনোদবাবুকে লক্ষ্য করে গুলি চালান।
গুলিটি বিনোদ থাপার পা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। গুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে ব্যারাকের অন্যান্য কর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাঁরাই রক্তাক্ত অবস্থায় বিনোদবাবুকে উদ্ধার করেন এবং অভিযুক্ত উমেশ ছেত্রীকে ধরে হেফাজতে নেন।
আহত আধিকারিকের অবস্থা ও আইনি পদক্ষেপ
গুলিবিদ্ধ এএসআই বিনোদ থাপাকে দ্রুত দার্জিলিং জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন:
- বিনোদবাবুর পায়ে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে।
- বর্তমানে তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালের কড়া পাহারায় চিকিৎসাধীন।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত এএসআই উমেশ ছেত্রীকে সরকারিভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রবিবার তাঁকে দার্জিলিং জেলা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁকে বিচার বিভাগীয় হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশি নীরবতা ও তদন্তের জটিলতা
এই স্পর্শকাতর ঘটনা জানাজানি হতেই পাহাড় জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমের কাছে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
তদন্তের মূল দিকগুলো:
- আভ্যন্তরীণ তদন্ত: কর্মক্ষেত্রে প্রচণ্ড কাজের চাপ নাকি ব্যক্তিগত শত্রুতা— ঠিক কী কারণে এই চরম আক্রোশ, তা খতিয়ে দেখতে বিভাগীয় তদন্ত (Departmental Inquiry) শুরু হয়েছে।
- নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন: সার্ভিস রিভলভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের এমন অপব্যবহার পুলিশ লাইনের নিরাপত্তা বিধিকেই বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আদালতের প্রশাসনিক রদবদল
ঘটনাচক্রে, এই মামলার আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন দার্জিলিং আদালতের সরকারি আইনজীবী বা এভিপি (APP)-র বদলি ঘিরে একটি প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। পূর্বতন সরকারি আইনজীবী বদলি হয়ে গিয়েছেন এবং নতুন এভিপি আগামী সোমবার কাজে যোগ দেবেন। ফলে অভিযুক্তের আইনি শুনানি এবং মামলার সওয়াল-জবাব সোমবারের পরেই গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শান্ত পাহাড়ে যেখানে পর্যটকদের ভিড় জমতে শুরু করেছে, সেখানে খোদ পুলিশ লাইনের ভেতরে এমন হিংস্রতা প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পুলিশ কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও এখানে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

