মথুরা-বৃন্দাবন থেকে ১৩০৫ কিলোমিটার দূরে বাংলারই এক জনপদে বিরাজ করছেন ‘বৃন্দাবনচন্দ্র’। হুগলি জেলার বলাগড় ব্লকের গুপ্তিপাড়ায় অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দির চত্বরটি কেবল আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র নয়, বরং স্থাপত্য ও ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। ‘বৃন্দাবনচন্দ্র জিউ অ্যান্ড এস্টেট’ নামে পরিচিত এই চত্বরটি চারশ বছরেরও বেশি প্রাচীন ইতিহাস বহন করছে।
ইতিহাস ও জনশ্রুতি
কথিত আছে, বাংলার কুখ্যাত সেনাপতি কালাপাহাড়ও এই মন্দিরের চৌকাঠ পেরোতে পারেননি, শ্রদ্ধায় নত করেছিলেন তাঁর মস্তক। শান্তিপুরের এক বিধবার কাছ থেকে বৃন্দাবনচন্দ্রের মূর্তিটি নিয়ে এসে এখানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাধু সত্যানন্দ সরস্বতী। বর্তমান মন্দিরটি ১৮০৭ সালে পুনর্নির্মিত হলেও বিগ্রহটি প্রায় চার শতাব্দী প্রাচীন।
স্থাপত্যের বিস্ময়: বাংলার টেরাকোটা ও বিশ্বজনীন ফ্রেস্কো
গুপ্তিপাড়ার এই মন্দির চত্বরে রয়েছে চারটি প্রধান মন্দির। তবে এর প্রধান আকর্ষণ হলো মন্দিরের দেওয়ালে থাকা বিরল ফ্রেস্কো (Fresco) বা দেওয়ালচিত্র।
- বৈচিত্র্য: এখানে বাংলার পটচিত্রের পাশাপাশি দেখা যায় ইউরোপীয় শৈলীর ফুলের তোড়া, মোগল নকশা, এমনকি চিনা ড্রাগন বা মাছের ছবি।
- শৈলী: শিল্পীদের তুলিতে ফুটে উঠেছে ভ্যান গঘের স্টাইলের উজ্জ্বল ফুল এবং ভ্যাটিকান সিটির সিস্টিন চ্যাপেলের আদলে সূক্ষ্ম কাজ। প্রাকৃতিক রঙে আঁকা এই ছবিগুলো ২০০ বছর পরেও বিস্ময় জাগায়।
মন্দির চত্বরের মূল আকর্ষণসমূহ
১. বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির: এখানকার জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তির বিশেষত্ব হলো এদের হাত রয়েছে, যা সচরাচর দেখা যায় না। ২. রামচন্দ্রের মন্দির: সম্পূর্ণ মন্দিরটি সূক্ষ্ম টেরাকোটা নকশায় আবৃত, যা বিষ্ণুপুরের মন্দিরকেও টেক্কা দিতে পারে। ৩. কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দির: নবাব আলিবর্দী খাঁ-র খাজনা মকুবের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই মন্দিরের অস্তিত্ব। ৪. চৈতন্যদেবের মন্দির: জোড়বাংলা স্থাপত্যের এই মন্দিরে হাত নামানো অবস্থায় নিতাই-গৌরের বিরল মূর্তি পূজিত হয়।

